যুক্তরাজ্য সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেলগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ করে তাদের সামরিক ব্যারাক ও অন্যান্য যৌথ আবাসনে স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তবে এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে মানবিক সংকট, চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়া এবং শিশুদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে হোম অফিসের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জও দায়ের করা হয়েছে।
গত ২৫ জুন হোম অফিস আরও ২০টি আশ্রয়প্রার্থী হোটেল বন্ধের ঘোষণা দেয়। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে আরও ১১টি হোটেল বন্ধ করা হয়েছিল। সরকার বলছে, হোটেলভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের আরও উপযুক্ত ও দীর্ঘমেয়াদি আবাসনে স্থানান্তর করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
তবে মানবাধিকার সংগঠন ও আইনজীবীদের অভিযোগ, হোটেল বন্ধের আগে বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, স্বাস্থ্যঝুঁকি কিংবা বিশেষ চাহিদার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। এ কারণে অনেক আশ্রয়প্রার্থীকে অল্প সময়ের নোটিশে এমন স্থানে পাঠানো হয়েছে, যেখানে তাদের চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে লন্ডনের স্টেসিটি হোটেলের কয়েকজন বাসিন্দার পক্ষে আদালতে মামলা করা হয়েছে। ডেপুটি হাই কোর্টের বিচারক জন হ্যালফোর্ড তার আদেশে উল্লেখ করেছেন, আশ্রয়প্রার্থীদের নতুন আবাসনের ‘যথোপযুক্ততা’ বিবেচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন—এমন অভিযোগ বিচারযোগ্য।
মামলার অন্যতম আবেদনকারী তিউনিসিয়া থেকে পালিয়ে আসা ৪১ বছর বয়সী প্রকৌশলী হুদা জানান, তার ১২ বছর বয়সী মেয়ে হুইলচেয়ার ব্যবহার করে এবং মৃগী ও হৃদরোগে আক্রান্ত। নতুন আবাসনে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
হুদা বলেন, “আমার সন্তানদের নিয়ে আমরা এখানে ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি। মেয়ে বাঙ্ক বেডে উঠতে ভয় পায়, তাই মেঝেতে ঘুমায়। ঘর এত ছোট যে করিডোরে দাঁড়িয়ে তার ন্যাপি পরিবর্তন করতে হয়। ওষুধ ফ্রিজে রাখতে হয়, কিন্তু এখানে কোনো ফ্রিজ নেই।”
তিনি আরও জানান, নতুন হোটেলে নেওয়ার জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং সেখানে শিশুদের জন্য রান্নারও কোনো ব্যবস্থা নেই।
এই মামলায় আশ্রয়প্রার্থীদের পক্ষে থাকা আইন প্রতিষ্ঠান ডেইটন পিয়ার্স গ্লিন-এর সলিসিটর রালিৎসা পেইকোভা বলেন, ব্যক্তিগত চাহিদা মূল্যায়ন না করেই এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে স্থানান্তর করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল এবং করদাতাদের অর্থের অপচয়।
অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের শরণার্থী সহায়তা সংস্থা অ্যাকশন ফর রিফিউজিস ইন লুইশাম-এর নির্বাহী পরিচালক ক্লোই হোয়াইট বলেন, সরকার হোটেল বন্ধকে সফলতা হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে পরিবারগুলোকে তাদের কমিউনিটি, সহায়তা ব্যবস্থা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।
আরেক আশ্রয়প্রার্থী ফারহাদ অভিযোগ করেন, তাকে মাত্র একটি পোস্ট-ইট নোটের মাধ্যমে জানানো হয় যে পরদিনই তাকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হবে। মানবপাচার, নির্যাতন ও শ্রম শোষণের শিকার এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ফারহাদ বলেন, স্থানান্তরের কারণে তার চিকিৎসাও ব্যাহত হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ক্যানসারের কেমোথেরাপি চলাকালীন একজন রোগীকেও চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আরেকজন মা হোম অফিসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তার ছেলের গুরুত্বপূর্ণ এ-লেভেল পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে তাকে ও তার সন্তানদের ৫৪৯ মাইল দূরের অ্যাবারডিনে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়, যা তার শিক্ষাজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
তবে হোম অফিস এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। এক মুখপাত্র বলেন, “এই সরকার সব আশ্রয়প্রার্থী হোটেল বন্ধ করবে এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আরও উপযুক্ত আবাসনে স্থানান্তরের কাজ এগিয়ে চলছে। তাদের কল্যাণ আমাদের অগ্রাধিকার এবং অতিরিক্ত প্রয়োজন থাকা ব্যক্তিদের চাহিদা পূরণে আমরা আবাসন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছি, যাতে স্থানান্তরের সময় বিঘ্ন যতটা সম্ভব কম হয়।”
হোটেল বন্ধের এই নীতি নিয়ে আইনি লড়াই ও বিতর্ক চলমান থাকলেও, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি—আশ্রয়প্রার্থীদের স্থানান্তরের আগে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বিশেষ প্রয়োজন যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করলে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

