ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) ব্যবস্থায় জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) বা পরিবার চিকিৎসকদের মধ্যে পূর্ণকালীন কাজের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণ অনুসারে, বর্তমানে মাত্র ১৯ শতাংশ জিপি পূর্ণকালীন কাজ করছেন, যা ২০১৯ সালের ২৭ শতাংশ থেকে অনেক কম। কোনো কোনো অঞ্চলে এই হার আরও ভয়াবহ — ব্রিস্টল, নর্থ সমারসেট ও সাউথ গ্লুচেস্টারশায়ারে মাত্র ৯.৪ শতাংশ জিপি ফুল-টাইম।
জিপিরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত কাগজপত্রের কাজ, হাসপাতাল থেকে চাপিয়ে দেওয়া জটিল কেস, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টা তাদের পেশাকে চরমভাবে চাপের মধ্যে ফেলেছে। ফলে বার্নআউট এড়াতে অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে পার্ট-টাইমে চলে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জিপি জানান, সকাল ৯টার মধ্যেই তাকে জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একজন ৮৮ বছরের বৃদ্ধার ফ্র্যাকচারের পরবর্তী যত্ন, আত্মহত্যাপ্রবণ তরুণের পরামর্শ — প্রতিটি কেসই জটিল। তিনি সপ্তাহে তিন দিন কাজ করেন। “হাসপাতাল এখন সবকিছু জিপিদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে,” বলেন তিনি।
আরেক জিপি মার্টিন ব্রুনেট (৫৮) বলেন, ২৫ বছর আগে দিনে ৪০-৫০ রোগী দেখা সম্ভব ছিল, কিন্তু এখন প্রতিটি পরামর্শ ১৫-২০ মিনিট লাগে। এডিএইচডি, অটিজম, জটিল দীর্ঘমেয়াদি রোগ — সবকিছুই বেড়েছে। রয়্যাল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টসের তথ্য অনুসারে, জিপি অ্যাপয়েন্টমেন্টের প্রায় ২৫ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সংক্রান্ত।
৪০ বছরের নিচে জিপিদের মধ্যে পূর্ণকালীন কাজের হার মাত্র ১১ শতাংশ। অনেকে ক্লিনিক্যাল কাজের পাশাপাশি শিক্ষকতা, লোকাম বা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছেন। সিনিয়র ডাক্তাররা নতুনদের ফুল-টাইম কাজ করতে নিরুৎসাহিত করছেন, কারণ ছয় সেশনের বেশি কাজ করলে দ্রুত বার্নআউট হয়।
একদিকে রোগীরা ডাক্তার দেখতে পাচ্ছেন না, অন্যদিকে অনেক যোগ্য জিপি স্থায়ী চাকরি খুঁজে পাচ্ছেন না। নাফিল্ড ট্রাস্টের বেক্স ফিশার বলেন, ২০১৯ সালের অতিরিক্ত ভূমিকা প্রতিদান স্কিম (ARRS)-এর কারণে ফিজিও, ফার্মাসিস্ট ও প্যারামেডিকদের মতো নন-জিপি কর্মী বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে প্র্যাকটিসগুলো সস্তায় অন্য কর্মী নিয়োগ করছে, জিপিদের নয়। ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে নতুন জিপির সংখ্যা বেড়ে ৪,০০০-এ পৌঁছেছে, কিন্তু নিয়োগের সুযোগ সীমিত।
গত বছর ১ কোটি ১০ লাখের বেশি ফিট নোট দেওয়া হয়েছে, যার ৯৩ শতাংশে কর্মীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। জিপিরা বলছেন, এটা তাদের কাজ নয়।
অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশে বেশি বেতন ও ভালো কর্মপরিবেশের কারণে ব্রিটিশ জিপিরা চলে যাচ্ছেন সেই সব দেশে।
আলিয়া ফাহমি নামের এক সাবেক জিপি এনএইচএস ছেড়ে প্রাইভেট সেক্টরে চলে গেছেন পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য। তিনি বলেন, “আরও জিপি নিয়োগ করে প্রত্যেকের রোগীর সংখ্যা কমাতে হবে।”
এনএইচএসের এই সংকট শুধু জিপিদের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য হুমকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক বোঝা কমানো, ফিট নোট ব্যবস্থার সংস্কার, জিপি নিয়োগ বৃদ্ধি এবং আর্থিক প্রণোদনা ছাড়া এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। অন্যথায় রোগীদের সেবা আরও খারাপের দিকে যাবে এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দেশত্যাগ অব্যাহত থাকবে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

