যুক্তরাজ্যের কেয়ার খাতে অভিবাসী কর্মী নিয়োগের ভিসা ব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরবর্তীতে লাইসেন্স বাতিল, স্থগিত বা অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া কেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো অভিবাসী কর্মীদের যুক্তরাজ্যে আনার জন্য অন্তত ৯৯ হাজার ৬৮৬টি স্পনসরশিপ সার্টিফিকেট (সিওএস) ইস্যু করেছিল।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর্মীদের কম বেতন দেওয়া, অস্তিত্বহীন বা ভুয়া চাকরির জন্য ভিসা স্পনসর করা এবং অবৈধভাবে কর্মী নিয়োগসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তথ্যগুলো প্রথমবারের মতো দেখাচ্ছে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে চালু হওয়া কেয়ার কর্মী ভিসা ব্যবস্থা কতটা ব্যাপকভাবে অপব্যবহারের শিকার হয়েছিল।
হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪৩টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্পনসর লাইসেন্স স্থগিতের নোটিশ দেওয়া হয়। একই সময়ে ১ হাজার ৪৯টি কেয়ার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। সব মিলিয়ে ১ হাজার ২৯৭টি প্রতিষ্ঠান অন্তত একটি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। এর মধ্যে ৩৪৫টি প্রতিষ্ঠান ১০০ বা তার বেশি স্পনসরশিপ সার্টিফিকেট ইস্যু করেছিল।
তবে প্রকৃত সংখ্যা ৯৯ হাজার ৬৮৬টির চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ পাঁচ বা তার কম সংখ্যক স্পনসরশিপ সার্টিফিকেট দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সরকারি নথিতে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মোট কত অভিবাসী কর্মী যুক্তরাজ্যে আসার সুযোগ পেয়েছেন, তা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তদন্তে কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ে। স্কটল্যান্ডের প্রিস্টিন হেলথকেয়ার গ্রুপ স্পনসর প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত হওয়ার সময় মাত্র একজন কর্মী নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছিল। কিন্তু তিন বছরেরও কম সময়ে প্রতিষ্ঠানটি অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে আনার জন্য ১৬৩টি স্পনসরশিপ সার্টিফিকেট ইস্যু করে। হোম অফিসের তদন্তে দেখা যায়, যেসব পদে কর্মীদের স্পনসর করা হয়েছিল, সেগুলোর কিছু বাস্তবে অস্তিত্বই ছিল না। এমনকি কেয়ার কর্মী হিসেবে আসা কয়েকজনকে রান্নাঘর ও অফিসে কাজ করতে পাওয়া যায়।
আরেক প্রতিষ্ঠান জিওকেয়ার সার্ভিসেস-এর বিরুদ্ধেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি স্পনসরশিপ সার্টিফিকেটে ঘোষিত বেতনের তুলনায় কর্মীদের উল্লেখযোগ্যভাবে কম অর্থ দিচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, কর্মীরা কাজে উপস্থিত না হওয়ায় তাদের কম বেতন দেওয়া হয়েছিল।
নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কেয়ার প্রতিষ্ঠানের স্পনসর লাইসেন্স বাতিল হলে সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্পনসর হওয়া অভিবাসী কর্মীদের সাধারণত নতুন স্পনসর খুঁজে নেওয়ার জন্য ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন স্পনসর না পেলে তাদের অবস্থান অনিয়মিত হয়ে পড়তে পারে এবং যুক্তরাজ্য থেকে অপসারণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বিতর্কিত এই কেয়ার ভিসা ব্যবস্থা সাবেক কনজারভেটিভ সরকারের সময়ে চালু হয়। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভিসা পাওয়া বা প্রবেশের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, যে সময়কে সমালোচকেরা ‘বোরিসওয়েভ’ নামে অভিহিত করেন। প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার অভিবাসী কেয়ার কর্মী ভিসা ব্যবস্থার আওতায় আসার পর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিদেশ থেকে নতুন কেয়ার কর্মী নিয়োগের আবেদন বন্ধ করে দেয় লেবার সরকার।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ-এর প্রস্তাবিত অভিবাসন সংস্কারে কেয়ার কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার সময়সীমা নিয়েও বিতর্ক চলছে। বর্তমান পাঁচ বছরের পরিবর্তে কিছু বিদেশি কেয়ার কর্মীকে ১৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে—এমন প্রস্তাব নিয়ে লেবার দলের ভেতরেই বিরোধিতা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এন্ডি বার্নহ্যাম সামাজিক কেয়ার খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে বিদেশি কেয়ার কর্মীদের এই কঠোর অভিবাসন নীতির কিছু অংশ থেকে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হোম অফিসের হিসাব অনুযায়ী, কেয়ার কর্মীদের যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ দিলে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ব্যয় ১০ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে।
কেয়ার খাতে অনিয়ম ঠেকাতে হোম অফিস ইতোমধ্যে শত শত প্রতিষ্ঠানের স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, কর্মীদের শোষণ, ভুয়া চাকরিতে ভিসা স্পনসর এবং অন্যান্য অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।
তবে এই তথ্য প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে, যেসব প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে গুরুতর অনিয়মের দায়ে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে, তাদের এত বিপুলসংখ্যক অভিবাসী কর্মী আনার অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়েছিল। অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা, স্পনসর প্রতিষ্ঠানের যাচাই এবং যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থার তদারকি—তিন ক্ষেত্রেই সরকারি নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

