TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্য-আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ডের তেল নিয়ে সংঘাতঃ ব্রিটিশ কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযান

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে ব্রিটেনের কাছ থেকে ‘পুনরুদ্ধার’ করার অঙ্গীকার করার পর দ্বীপগুলোর আশপাশে তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেছে আর্জেন্টিনা। এরই মধ্যে তেল প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

শনিবার সকালে মিলেইয়ের কার্যালয় জানায়, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে তেল অনুসন্ধান কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানের অংশীদার এবং তেল প্রকল্পে সেবা দেওয়া ব্যবসাগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে।

শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মিলেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবি জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং দ্বীপগুলো ‘পুনরুদ্ধার’ করার কোনো বিকল্প নেই।

মিলেই বিশেষভাবে দ্বীপগুলোর আশপাশের সমুদ্রসীমায় তেল অনুসন্ধানকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। তাঁর আশঙ্কা, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে তেল কোম্পানিগুলো সমুদ্রের নিচে থাকা তেল উত্তোলনের বাস্তব সক্ষমতা অর্জন করবে, যা আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবিকে আরও কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলবে।

বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে সি লায়ন তেলক্ষেত্র। এই প্রকল্পে যুক্তরাজ্যভিত্তিক রকহপার এবং ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান নাভিতাস যুক্ত রয়েছে। তেলক্ষেত্রটিতে উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৮ সাল। ফলে উৎপাদন শুরুর আগেই আর্জেন্টিনা আইনি ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে হাঁটছে।

তবে রকহপার জানিয়েছে, আর্জেন্টিনা সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে প্রকল্পটির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করছে না।

আর্জেন্টিনার কঠোর অবস্থানের জবাবে যুক্তরাজ্যও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্যের অবস্থান অটল। দ্বীপগুলো ব্রিটিশ ছিল, ব্রিটিশ আছে এবং ব্রিটিশই থাকবে—কারণ সেখানকার জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ব্রিটিশ হিসেবে থাকার পক্ষে।

তিনি আরও বলেন, ফকল্যান্ডবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে সুরক্ষিত এবং যুক্তরাজ্য তা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করবে।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের প্রতি যুক্তরাজ্যের অঙ্গীকারকে ‘সম্পূর্ণ ও অটল’ বলে ঘোষণা করেছেন।

২০১৩ সালের গণভোটে ফকল্যান্ড দ্বীপবাসীদের ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। বিপক্ষে ভোট পড়েছিল মাত্র তিনটি। দ্বীপপুঞ্জের আইনসভাও জানিয়েছে, আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক হুমকি ও দাবি তাদের ব্রিটিশ হিসেবে থাকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবে না।

ফকল্যান্ড নিয়ে দুই দেশের বিরোধের ইতিহাস রক্তাক্ত। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জে সামরিক অভিযান চালালে শুরু হয় ফকল্যান্ড যুদ্ধ। ৭০ দিনের বেশি সময় ধরে চলা সেই যুদ্ধে ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা, ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন এবং তিনজন ফকল্যান্ড দ্বীপবাসী নিহত হন।

চার দশকের বেশি সময় পর সরাসরি যুদ্ধ না হলেও দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধ আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে। এবার সেই পুরোনো বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমুদ্রের নিচে থাকা বিপুল তেলসম্পদ।

মিলেই শুধু রাজনৈতিক দাবি পুনর্ব্যক্ত করেই থেমে থাকেননি। আর্জেন্টিনার দক্ষিণাঞ্চল তিয়েরা দেল ফুয়েগোতে নতুন একটি নৌঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছেন তিনি। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সমর্থন নাও করতে পারে।

ট্রাম্পের এই অবস্থান ফকল্যান্ড প্রশ্নে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে ডাউনিং স্ট্রিট ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে সরাসরি কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়া না দিয়ে জানিয়েছে, বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিজস্ব ব্যাপার।

ব্রিটিশ সরকার একই সঙ্গে জানিয়েছে, আর্জেন্টিনার সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে এবং সেই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই তারা কাজ করতে চায়।

অন্যদিকে মিলেইয়ের সরকার ফকল্যান্ডের তেলসম্পদকে আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করছে। ফলে সামনে তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা, আইনি পদক্ষেপ এবং কূটনৈতিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সূত্রঃ ডেইলি মিরর, রয়টার্স, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট,

এম.কে

আরো পড়ুন

২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যে কার্যকর হচ্ছে একগুচ্ছ নতুন আইনঃনতুন বছরে ব্রিটিশদের জন্য কী বদলাচ্ছে

যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত, বিদেশিদের ভাতা বন্ধের ঘোষণা রিফর্ম পার্টির

ডিউক অফ সাসেক্সের ক্ষতিপূরণ দাবীর মামলা যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টে