যুক্তরাজ্যে ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের উচ্চ করনীতি, দুর্বল কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এবং অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রেকর্ড সংখ্যক তরুণ ব্রিটিশ দেশ ছাড়ছেন বলে নতুন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস (ওএনএস) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে দেশে ফেরার তুলনায় ১ লাখ ৩৬ হাজার বেশি ব্রিটিশ নাগরিক যুক্তরাজ্য ত্যাগ করেছেন, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ নেতিবাচক নিট অভিবাসনের রেকর্ড।
বিশেষ করে ১৬ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বিদেশমুখী প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই বয়সসীমায় ৭৫ হাজার বেশি তরুণ দেশ ছেড়েছেন, যা ওএনএস ২০২১ সালে নতুন পদ্ধতিতে তথ্য প্রকাশ শুরু করার পর সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকদের মতে, কাজ, উচ্চ আয়ের সুযোগ এবং উন্নত জীবনমানের আশায় বিপুলসংখ্যক তরুণ ব্রিটিশ অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
ওএনএসের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সামগ্রিক নিট অভিবাসন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজারে, যা করোনা মহামারির পর গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২১ সালের পর এই প্রথম নিট অভিবাসন ২ লাখের নিচে নামল। সংস্থাটি বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলো থেকে কম সংখ্যক কর্মী ও শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যে আসায় এই পতন ঘটেছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মোট ২ লাখ ৪৬ হাজার ব্রিটিশ নাগরিক দেশ ছেড়েছেন। যদিও আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কিছুটা কম, তবে দেশে ফেরার হার আরও দ্রুত কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে ১ লাখ ৪০ হাজার ব্রিটিশ নাগরিক দেশে ফিরেছিলেন, সেখানে চলতি বছরে ফিরেছেন মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার।
তরুণদের বিদেশে যাওয়ার অন্যতম বড় গন্তব্য হয়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়া। “ওয়ার্কিং হলিডে মেকার” ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া ব্রিটিশ তরুণদের সংখ্যা মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২২-২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৮ হাজার ১৭৭, যা ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯ হাজার ৪১২-এ। এই ভিসার আওতায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা তিন বছর পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় কাজ ও পড়াশোনার সুযোগ পান।
এছাড়া পোলিশ বংশোদ্ভূত তরুণ ব্রিটিশদের অনেকেই পারিবারিক শিকড়ে ফিরছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পোল্যান্ডে ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ২০১৫ সালের ৪২ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১ লাখ ৮৫ হাজারে পৌঁছেছে।
ওএনএসের এক মুখপাত্র বলেন, ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছর তরুণ ব্রিটিশদের নেতিবাচক নিট অভিবাসন বাড়ছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে বিদেশে কাজ বা পড়াশোনার জন্য যাওয়া তরুণদের বড় অংশ আর দেশে ফিরছেন না।
এদিকে ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের অর্থনৈতিক নীতিকে ঘিরেও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন সরকার গত দুই বছরে পরিবার ও ব্যবসা খাতে একাধিক কর বৃদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দশকের শুরুতে যুক্তরাজ্যের সরকারি রাজস্ব দেশটির মোট জিডিপির ৪২ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাবে, যা উন্নত বিশ্বে অন্যতম দ্রুত কর বৃদ্ধির উদাহরণ হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ দাবি করেছেন, তিন বছরে নিট অভিবাসন ৮২ শতাংশ কমেছে এবং সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে “বাস্তব অগ্রগতি” অর্জন করেছে। তিনি বলেন, নতুন দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা চালু করে বিদেশি সস্তা শ্রমিকের ওপর ব্রিটেনের নির্ভরতা কমানো হবে।
তবে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে।
ছায়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ বলেন, উচ্চ কর, বাড়তি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্বল চাকরির বাজারের কারণে তরুণরা “লেবার সরকারের ব্রিটেন” ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তার দাবি, তরুণদের বেকারত্বের হার এখন ১৫ শতাংশ, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। লন্ডনে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, আশ্রয়প্রার্থী ইস্যুতেও বড় পরিবর্তনের তথ্য প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র দপ্তর। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের হোটেলগুলোতে অস্থায়ীভাবে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ৮৮৫-এ নেমেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ কম। তবে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বাসা ও ফ্ল্যাটভিত্তিক আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৬৮ হাজার ৭১৯-এ পৌঁছেছে।
একই সময়ে আশ্রয় আবেদন ১২ শতাংশ কমে ৯৩ হাজার ৫২৫-এ নেমেছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি মানুষ অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন এবং প্রায় ৩৯ শতাংশ কাজ, শিক্ষা বা ভিজিট ভিসায় এসে পরে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
স্বরাষ্ট্র দপ্তর গত এক বছরে রেকর্ড ১ লাখ ৫১ হাজারের বেশি আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফলে আশ্রয় আবেদন জট ২০১৯ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্বের আবেদনও নতুন রেকর্ড গড়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ৩ লাখের বেশি মানুষ ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদন করেছেন।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

