একজন রোগীকে ‘মিস্টার’ বলে সম্বোধন করার অভিযোগে বরখাস্তের মুখে পড়েছেন যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএস-এর একজন অভিজ্ঞ নার্স। ঘটনাটি ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে এবং স্বাস্থ্যখাতে লিঙ্গনীতি, কর্মীদের বিবেকের স্বাধীনতা ও পেশাগত অধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
৪০ বছর বয়সী নার্স জেনিফার মেলে প্রায় দুই বছর ধরে তার কর্মস্থল এপসম ও সেন্ট হেলিয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসা এক ট্রান্সজেন্ডার রোগীকে তিনি ‘মিস্টার’ ও পুরুষবাচক সম্বোধনে উল্লেখ করেন। চিকিৎসা নথিতে ওই রোগীকে পুরুষ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল এবং চিকিৎসার সময়ও সেই পরিচয় ব্যবহার করা হয়।
জেনিফার মেলে জানান, তিনি রোগীকে স্পষ্টভাবে বলেন যে তার খ্রিস্টান বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত বিবেকের কারণে তিনি নারী হিসেবে সম্বোধন করতে পারেন না। তবে তিনি রোগীকে নাম ধরে ডাকতে রাজি ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই বক্তব্যের পর রোগী তার প্রতি তীব্র বর্ণবাদী ও ধর্মবিদ্বেষী গালিগালাজ করেন এবং আক্রমণাত্মক আচরণ প্রদর্শন করেন।
ঘটনার পর মেলে ওই বর্ণবাদী অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে জানালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা রোগীর গোপনীয়তা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বিষয়টি নার্সিং ও ধাত্রীবিদ্যা নিয়ন্ত্রক পরিষদের কাছে পাঠানো হয়। আসন্ন শুনানিতে তার ১৩ বছরের পেশাগত জীবন ও নিবন্ধন বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং জেনিফার মেলের প্রতি সংহতি জানাতে লন্ডনে একাধিক নার্স ও নারী অধিকারকর্মী একত্রিত হন। তারা বলেন, একজন নার্সকে নিজের বিশ্বাস ও বিবেক অনুযায়ী কথা বলার কারণে শাস্তি দেওয়া পেশাগত স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং এতে কর্মক্ষেত্রে নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।
বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কয়েকজন সংসদ সদস্য বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী জৈবিক লিঙ্গ আইনগতভাবে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান সেই নির্দেশনা অনুসরণ করছে না। তাদের মতে, এই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা স্বাস্থ্যখাতে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
জেনিফার মেলের পুনর্বহালের দাবিতে একটি অনলাইন আবেদনপত্রে ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাকে চাকরিতে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, এপসম ও সেন্ট হেলিয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি বর্ণবাদী আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেছে, রোগীর ব্যক্তিগত চিকিৎসা তথ্য প্রকাশ করা নীতিমালার পরিপন্থী এবং সব কর্মীকে গোপনীয়তা রক্ষার বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে।
এই ঘটনা এখন আর শুধু একজন নার্সের ব্যক্তিগত শাস্তির বিষয় নয়। এটি যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যখাতে লিঙ্গনীতি, আইনের প্রয়োগ এবং কর্মীদের মৌলিক অধিকার রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রঃ দ্য এক্সপ্রেস
এম.কে

