২০২৮ সালের লন্ডন মেয়র নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। কনজারভেটিভ দলের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য স্যার জেমস ক্লেভারলি ছায়া মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে লন্ডনের মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচনের প্রায় দুই বছর আগেই তার এই সিদ্ধান্ত রাজধানীর মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।
ক্লেভারলি বর্তমানে কনজারভেটিভ দলের ছায়া আবাসন, সম্প্রদায় ও স্থানীয় সরকারবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। দলীয় নেতা কেমি ব্যাডেনককে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তিনি পদটি ছেড়ে দিয়েছেন। তার বক্তব্য, লন্ডনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিটি বিষয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলা এবং নির্বাচনী প্রচারণায় পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়ার জন্য ছায়া মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
লন্ডনের মেয়র পদে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করে ক্লেভারলি বলেন, রাজধানীর শুধু একজন প্রশাসক নয়, বরং এমন একজন নেতৃত্ব প্রয়োজন যিনি শহরের সম্ভাবনা বোঝেন এবং তার ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত। তিনি লন্ডনের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ভাবমূর্তি পুনর্গঠন এবং শহরটিকে বসবাস, কাজ, বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিশ্বের অন্যতম সেরা স্থানে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বর্তমান মেয়র স্যার সাদিক খানকে নিয়েও সরাসরি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন ক্লেভারলি। তার অভিযোগ, লেবার পার্টির দীর্ঘদিনের শাসনে লন্ডন হতাশ হয়েছে এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা হয়নি। তিনি লন্ডনবাসীর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের বাড়ি, ব্যবসার জন্য অনুকূল পরিবেশ এবং উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় ও নিয়ন্ত্রণ কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের বিরুদ্ধেও কঠোর অভিযোগ করেছেন ক্লেভারলি। তার দাবি, কেন্দ্রীয় সরকার লন্ডনকে এমন একটি জায়গা হিসেবে দেখছে যেখান থেকে কর আদায়, নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ নেওয়া যায়। লন্ডনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পুরো দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পরিবর্তে রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তবে ক্লেভারলির প্রার্থিতা এখনো চূড়ান্তভাবে কনজার্ভেটিভ দলের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন নয়। দলীয় প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়া এখনো বাকি। তারপরও তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং লন্ডনের রাজনীতিতে পূর্বের ভূমিকার কারণে তাকে রক্ষণশীলদের অন্যতম শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেমি ব্যাডেনক ক্লেভারলিকে ছায়া মন্ত্রিসভা হতে হারাতে চাননি বলে দলের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। তবে একই সূত্রের ভাষ্য, লন্ডনের মেয়র নির্বাচনে ক্লেভারলির মতো অভিজ্ঞ ও পরিচিত একজন রাজনীতিককে প্রার্থী হিসেবে পাওয়া ককনজার্ভেটিভ দলের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে। তার পদত্যাগের ফলে ব্যাডেনককে ছায়া মন্ত্রিসভায় নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন করতে হবে।
ক্লেভারলি কনজার্ভেটিভ দলের জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে শিক্ষামন্ত্রীসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেছেন। ২০১৫ সালে ব্রেইনট্রি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি লন্ডন পরিষদে কনজার্ভেটিভ দলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
২০২৪ সালে কনজার্ভেটিভ দলের নেতৃত্বের জন্যও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ক্লেভারলি। সেই প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত কেমি ব্যাডেনকের কাছে পরাজিত হন। এবার তার লক্ষ্য দলীয় নেতৃত্ব নয়, বরং লন্ডনের মেয়র পদ দখল করে রাজধানীতে কনজারভেটিভ দলের রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করা।
২০২৪ সালের সর্বশেষ মেয়র নির্বাচনে সাদিক খান কনজারভেটিভ প্রার্থী সুসান হলকে ২ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন। তিনি মোট ভোটের ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ পেয়েছিলেন এবং লন্ডনের ১৪টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ৯টিতে জয় পান। তবে ২০২৮ সালে সাদিক খান চতুর্থ মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অন্যদিকে, কনজারভেটিভদের পাশাপাশি রিফর্ম ইউকেও ইতোমধ্যে ২০২৮ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলটি জানুয়ারিতেই ওয়েস্টমিনস্টার সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলর লায়লা কানিংহামকে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ফলে আগামী মেয়র নির্বাচন লেবার ও কনজারভেটিভ দলের দ্বিমুখী লড়াইয়ের বাইরে আরও বিস্তৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে পারে।
ক্লেভারলির ঘোষণার পর রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ কনজারভেটিভদের তীব্র আক্রমণ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, কনজারভেটিভ দল কার্যত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং ক্লেভারলি এসেক্সে নিজের সংসদীয় আসন ধরে রাখার আশা হারিয়েছেন বলেই লন্ডনের মেয়র পদে লড়াইয়ের দিকে ঝুঁকেছেন। তবে ক্লেভারলি এখনো সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে ক্লেভারলির সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু লন্ডনের মেয়র নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীতে লেবার দলের দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভাঙতে পারা কনজারভেটিভ দলের জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী জয় হিসেবে দেখা হবে। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচন এখন থেকেই কনজারভেটিভদের জন্য লন্ডনে নিজেদের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের বড় পরীক্ষায় পরিণত হচ্ছে।
সূত্রঃ বিবিসি\ আইটিভি\দ্য গার্ডিয়ান\ ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য টাইমস
এম.কে

