মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি বিতর্কিত বার্তাকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন ও ইরানের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, লন্ডনে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসের “অগ্রহণযোগ্য ও উসকানিমূলক মন্তব্যের” জেরে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আলী মুসাভিকে তলব করা হয়েছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানি দূতাবাস সম্প্রতি তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে ব্রিটেনে বসবাসরত ইরানিদের জন্য “মাতৃভূমির জন্য আত্মত্যাগ” শীর্ষক একটি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানায়। সেখানে বলা হয়, “ইরানের সকল গর্বিত পুত্র ও কন্যা” যেন ঐক্য, আনুগত্য ও জাতীয় গর্বের প্রকাশ ঘটায় এবং প্রয়োজনে নিজেদের জীবন উৎসর্গের জন্য প্রস্তুত থাকে। বার্তার শেষাংশে উল্লেখ করা হয়, “শত্রুর কাছে দেশ সমর্পণ করার চেয়ে জীবন উৎসর্গ উত্তম।”
এই বক্তব্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, এতে যুক্তরাজ্যের ভেতরে কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহিংসতার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। এ প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ব্রিটিশ মন্ত্রী হ্যামিশ ফ্যালকনার ইরানি রাষ্ট্রদূতকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, এ ধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো যোগাযোগ চলতে পারে না, যা সহিংসতা উসকে দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
ব্রিটিশ সরকার বলছে, ইরান ও রাশিয়ার মতো “শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র” থেকে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকি সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের কার্যক্রম নিয়ে লন্ডনের উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
তবে ইরানের দূতাবাস এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, এটি কোনোভাবেই বিদেশে সহিংসতার আহ্বান ছিল না। বরং এটি ছিল জাতীয় সংহতি, দেশপ্রেম এবং বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মাতৃভূমি রক্ষার নৈতিক প্রস্তুতির প্রতীকী প্রকাশ।
তাদের দাবি, “জীবন উৎসর্গের আহ্বান” হিসেবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা বিভ্রান্তিকর ও ভুল। এই কর্মসূচির লক্ষ্য কেবল ইরানি জনগণের মধ্যে ঐক্য ও দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার মনোভাব জোরদার করা।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ইরানের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আলী মুসাভিকে এই প্রথম তলব করা হয়নি। গত মার্চ মাসেও তাকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরে ডাকা হয়, যখন এক ইরানি নাগরিক এবং এক দ্বৈত ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিকের বিরুদ্ধে লন্ডনের ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানের ওপর নজরদারি চালানোর অভিযোগ ওঠে।
একই সময়ে ব্রিটেন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে অগ্নিসংযোগ হামলার ঘটনাও নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব হামলার দায় একটি রহস্যময় অনলাইন গোষ্ঠী স্বীকার করলেও, এর পেছনে ইরানি রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ব্রিটেনে দাবিকৃত হামলাগুলোর বেশিরভাগই উত্তর লন্ডনকেন্দ্রিক, যেখানে দেশটির প্রায় তিন লাখ ইহুদি জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি বসবাস করে। একই ধরনের হামলার ধারা জার্মানি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডসেও দেখা গেছে।
ব্রিটেনের সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশের জ্যেষ্ঠ জাতীয় সমন্বয়ক ভিকি ইভানস জানিয়েছেন, পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে এসব হামলার সঙ্গে ইরান বা তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না। তিনি বলেন, ইরানি শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে “অপরাধী প্রক্সি” ব্যবহার করে থাকে এবং এখন তদন্তকারীরা বিবেচনা করছেন, লন্ডনেও কি একই কৌশলে সহিংসতাকে ভাড়াভিত্তিক সেবায় পরিণত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো শুধু কূটনৈতিক উত্তেজনা নয়, বরং যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, প্রবাসী সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন এক জটিল বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্রিটেন এখন একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করছে, অন্যদিকে ইরানের প্রতি কূটনৈতিক চাপও বাড়িয়ে তুলছে।
সূত্রঃ দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
এম.কে

