লন্ডনে সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা কমানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক ও আইনি সংঘাতের সূচনা হয়েছে। রাজধানীর তিনটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ—টাওয়ার হ্যামলেটস, হ্যাকনি এবং লিউইশাম কাউন্সিল—লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের বিরুদ্ধে বিচারিক পর্যালোচনার (জুডিশিয়াল রিভিউ) আবেদন করেছে।
কাউন্সিলগুলোর অভিযোগ, নতুন আবাসন নীতি গ্রহণের আগে মেয়র কার্যালয় আইন অনুযায়ী স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ করেনি। তাদের দাবি, এই সিদ্ধান্ত রাজধানীতে প্রকৃত সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণকে আরও কঠিন করে তুলবে এবং ইতোমধ্যে ভয়াবহ হয়ে ওঠা আবাসন সংকটকে আরও গভীর করবে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবরে গৃহীত একটি নীতিগত পরিবর্তন। ওই সময় যুক্তরাজ্য সরকার ও লন্ডনের মেয়র যৌথভাবে নতুন আবাসন প্রকল্পে অ্যাফোর্ডেবল হাউজিংয়ের বাধ্যতামূলক লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে। সরকারের যুক্তি ছিল, কঠোর শর্তের কারণে অনেক প্রকল্প আর্থিকভাবে লাভজনক থাকছে না এবং ফলে নতুন বাড়ি নির্মাণে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, লন্ডনের আবাসন চাহিদা পূরণে বছরে প্রায় ৮৮ হাজার নতুন বাড়ি প্রয়োজন। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্মিত হয়েছে মাত্র ৩১ হাজার নতুন বাড়ি। একই সময়ে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৩ হাজার ৯৯১টিতে।
নতুন নীতির আওতায় যেসব ডেভেলপার তাদের প্রকল্পে কমপক্ষে ২০ শতাংশ সাশ্রয়ী আবাসন অন্তর্ভুক্ত করবে, তারা দ্রুত পরিকল্পনা অনুমোদনের সুবিধা পাবে। তবে সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে ডেভেলপারদের সুবিধা দিলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসন সংকটের কোনো সমাধান দেবে না।
হ্যাকনির গ্রিন পার্টির মেয়র জো গারবেট বলেন, তাদের এলাকায় প্রায় ৮ হাজার পরিবার কাউন্সিল হাউজিংয়ের অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে এবং ৩ হাজার ৫০০ পরিবার অস্থায়ী আবাসনে বসবাস করছে। তার অভিযোগ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতামত উপেক্ষা করে মেয়র সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন এবং ডেভেলপারদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
হ্যাকনি কাউন্সিল বর্তমানে নতুন প্রকল্পে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয়ী আবাসনের শর্ত আরোপ করে থাকে। গারবেটের মতে, এই মানদণ্ড কমিয়ে আনা সমস্যার সমাধান নয়, বরং সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি করবে।
টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র লুৎফুর রহমানও নতুন নীতির কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, পুরো লন্ডনের জন্য একক ২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ বাস্তবসম্মত নয়। বরোভেদে পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায় স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তার মতে, টাওয়ার হ্যামলেটসে উচ্চ অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং লক্ষ্যমাত্রা বজায় রেখেও প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে এবং কোনো ডেভেলপার কেবল এই কারণে প্রকল্প থেকে সরে যায়নি। বর্তমানে বরোটিতে ৩১ হাজারের বেশি মানুষ আবাসনের অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন।
লিউইশামের গ্রিন মেয়র লিয়াম শ্রিভাস্তাভা এই সিদ্ধান্তকে “রাজনৈতিক নাটক” হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, সমস্যার মূল কারণ শুধু নতুন বাড়ির ঘাটতি নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে আবাসন প্রকল্প নির্মিত হলেও তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে। লিউইশামে বর্তমানে ১০ হাজার ৫০০ পরিবার হাউজিং ওয়েটিং লিস্টে রয়েছে এবং প্রায় ১৪ হাজার পরিবার অতিরিক্ত জনাকীর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে।
অন্যদিকে নির্মাণ খাতের প্রতিনিধিরা মেয়রের অবস্থানকে সমর্থন করছেন। হোম বিল্ডার্স ফেডারেশনের কর্মকর্তা স্টিভ টার্নার বলেন, লন্ডনে আবাসন সরবরাহ প্রায় ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ হলো প্রকল্পগুলোর আর্থিক অকার্যকারিতা। তার মতে, অতিরিক্ত উচ্চ অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং কোটা চাপিয়ে দিলে আরও কম প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।
এদিকে পিবডি হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী ইয়ান ম্যাকডারমট সতর্ক করে বলেছেন, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্পগুলো ক্রমেই আর্থিক চাপে পড়ছে।
লন্ডনের আবাসন সংকট ইতোমধ্যেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ অস্থায়ী আবাসনে বসবাস করছে এবং সামাজিক আবাসনের অপেক্ষমাণ তালিকাও ইতিহাসের অন্যতম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় লন্ডনের বিভিন্ন কাউন্সিলকে প্রতিদিন প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করতে হচ্ছে।
আইনি চ্যালেঞ্জটি এখন গ্রেটার লন্ডন অথরিটির (জিএলএ) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। আদালত যদি কাউন্সিলগুলোর যুক্তি গ্রহণ করে, তবে মেয়রের নতুন আবাসন নীতি পুনর্বিবেচনার মুখে পড়তে পারে।
তবে মেয়র সাদিক খান তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তিনি বলেছেন, লন্ডনের আবাসন সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন এবং তার প্রশাসনের বিনিয়োগের ফলে ১৯৭০-এর দশকের পর সবচেয়ে বেশি কাউন্সিল হোম নির্মিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আইনি লড়াই শুধু আবাসন নীতির বিরোধ নয়; বরং এটি স্থানীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার এবং লন্ডন মেয়র কার্যালয়ের মধ্যে ক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণের প্রশ্নেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে যাচ্ছে। এর ফলাফল ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের অন্যান্য শহরের আবাসন নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

