যুক্তরাজ্যের আশ্রয়ব্যবস্থায় সংস্কারের অংশ হিসেবে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য নতুন কমিউনিটি স্পনসরশিপ কর্মসূচির বিস্তারিত প্রকাশ করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের ঘোষিত এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় কমিউনিটি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শরণার্থীদের যুক্তরাজ্যে এনে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ বৈধ অভিবাসনের পথ সম্প্রসারণের পাশাপাশি সমাজে শরণার্থীদের দ্রুত একীভূত হতে সহায়তা করবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচিটি কানাডার দীর্ঘদিনের সফল কমিউনিটি স্পনসরশিপ মডেল অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। কানাডা ১৯৭৯ সাল থেকে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে চার লাখের বেশি শরণার্থী পুনর্বাসন করেছে। যদিও যুক্তরাজ্যের পরিকল্পিত কর্মসূচি প্রাথমিকভাবে ছোট পরিসরে শুরু হবে, সরকারের আশা, অভিবাসনব্যবস্থার ওপর জনআস্থা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মানবিক সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের দায়িত্ব রয়েছে। তবে নতুন যেকোনো শরণার্থী কর্মসূচি এমনভাবে পরিচালিত হবে, যাতে দেশের আবাসন, জনসেবা এবং সমাজে একীভূত করার সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। একই সঙ্গে অনিয়মিত অভিবাসন, বিশেষ করে ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের প্রবণতা কমানোর কৌশলের অংশ হিসেবেও এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে এর আগে সীমিত পরিসরে কমিউনিটি স্পনসরশিপ কর্মসূচি চালু ছিল। ২০১৬ সাল থেকে এর আওতায় প্রায় ৬০০ জন শরণার্থী পুনর্বাসিত হয়েছেন। তবে স্পনসর হতে আগ্রহী দলগুলোকে সরকারি অনুমোদনের পাশাপাশি অন্তত ৯ হাজার পাউন্ড তহবিল সংগ্রহের শর্ত পূরণ করতে হতো।
নতুন পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, স্পনসররা এখন নির্দিষ্ট শরণার্থীকে মনোনয়ন দিতে পারবেন। এতদিন জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা মানবিক প্রয়োজন ও ঝুঁকির ভিত্তিতে শরণার্থী নির্বাচন করলেও নতুন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের ভিত্তিতেও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি ধর্মীয় ও কমিউনিটি সংগঠনের পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নিয়োগকারী সংস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ও স্পনসর হওয়ার সুযোগ পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে স্পনসর করার সুযোগ শরণার্থীদের দ্রুত সমাজে একীভূত হওয়া, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে আশঙ্কাও রয়েছে যে, যাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বা পরিচিতি বেশি, তারা তুলনামূলক বেশি সুযোগ পেতে পারেন। এতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শরণার্থীরা পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সরকার জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচিতেও কারা পুনর্বাসনের জন্য যোগ্য হবেন, সে বিষয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার ভূমিকা বহাল থাকবে। তবে ভবিষ্যতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কর্মসংস্থানে দ্রুত যুক্ত হতে পারবেন—এমন শরণার্থীদের প্রতি গুরুত্ব বাড়তে পারে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে যুক্তরাজ্য প্রধানত নির্যাতনের শিকার, চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তি, ঝুঁকিতে থাকা নারী ও শিশু এবং পারিবারিক পুনর্মিলনের মতো মানবিক বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে শরণার্থী পুনর্বাসন করেছে। ফলে পুনর্বাসিত অনেক শরণার্থীর বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে এবং তাদের কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে তুলনামূলক বেশি সময় লেগেছে।
অন্যদিকে কানাডার অভিজ্ঞতা বলছে, কমিউনিটি স্পনসরশিপের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সামাজিক নেটওয়ার্ক শরণার্থীদের দ্রুত চাকরি খুঁজে পেতে এবং আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে সহায়তা করে। তবে যুক্তরাজ্যেও একই ফল মিলবে কি না, নাকি আগে থেকেই দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের বেশি সুযোগ দেওয়া হবে—তা ভবিষ্যতে মূল্যায়নের বিষয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে গবেষণায় দেখা গেছে, কমিউনিটি স্পনসরশিপ রাষ্ট্রের দায়িত্ব পুরোপুরি কমিয়ে দিতে পারে না। বরং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ, স্পনসরদের যাচাই, পুনর্বাসন কার্যক্রম তদারকি এবং প্রয়োজনে বিকল্প সহায়তা দেওয়া কর্মসূচির সফলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, শক্তিশালী সরকারি কাঠামো ছাড়া কমিউনিটি স্পনসরশিপ কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে সরকারের দাবি, নতুন কমিউনিটি স্পনসরশিপ কর্মসূচি বৈধ পথে শরণার্থী পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াবে এবং সমাজে তাদের দ্রুত একীভূত হতে সহায়তা করবে। তবে অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু নতুন কর্মসূচি চালু করাই যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, কমিউনিটি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয়, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নীতিও নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্রঃ দ্য কনভারসেশন
এম.কে

