TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্য ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার প্রতীকী গণভোটে পিডিংটন গ্রাম

অক্সফোর্ডশায়ারের ছোট্ট গ্রাম পিডিংটনে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের সরকারি পরিকল্পনাকে ঘিরে নজিরবিহীন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মাত্র ৩৫০ জন বাসিন্দার এই গ্রাম প্রতীকীভাবে যুক্তরাজ্য ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে একটি স্বাধীনতা গণভোটের উদ্যোগ নিয়েছে। গ্রামবাসীদের দাবি, তাদের মতামত বা পরামর্শ ছাড়াই পাশের সাবেক সামরিক স্থাপনায় ১ হাজার ২৫০ জন অবিবাহিত পুরুষ আশ্রয়প্রার্থীকে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রামের পাশের পরিত্যক্ত বিসেস্টার গ্যারিসনকে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনে রূপান্তর করা হবে। এটি লেবার সরকারের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ, যার লক্ষ্য আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেল ধীরে ধীরে বন্ধ করে সাবেক সামরিক স্থাপনাগুলোকে বিকল্প আবাসন হিসেবে ব্যবহার করা। জানা গেছে, বিভিন্ন দেশের এসব আশ্রয়প্রার্থী আগামী নভেম্বর থেকে সেখানে আসা শুরু করবেন। তারা ক্যাম্পের বাইরে চলাফেরা করতে পারলেও কাজ করার অনুমতি পাবেন না।

এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গ্রামবাসীরা প্রতীকী স্বাধীনতা গণভোটের ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও বর্তমান যুক্তরাজ্যের আইনে কোনো গ্রাম একতরফাভাবে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে সরকারের পাশাপাশি পার্লামেন্টের অনুমোদনও প্রয়োজন হবে। তবুও গ্রামবাসীরা বলছেন, সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং তাদের উদ্বেগ তুলে ধরার এটিই একমাত্র উপায়।

বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে যখন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিডিংটনের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি মন্তব্য করেন, ছোট্ট পিডিংটনের মতো যেসব জনপদ নিজেদের কোনো দোষ ছাড়াই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে পুরো ব্রিটেন একই ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে।

স্থানীয় প্যারিশ কাউন্সিলর জো মার্শাল বলেন, গ্রামের মানুষ আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নন। তবে মাত্র ৩৫০ জনের একটি গ্রামে একসঙ্গে ১ হাজার ২৫০ জন অবিবাহিত পুরুষকে স্থানান্তর করা বাস্তবসম্মত নয়। তার দাবি, গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই নারী ও শিশু এবং স্থানীয় অবকাঠামো এত বড় সংখ্যক নতুন বাসিন্দার চাপ সামাল দেওয়ার উপযোগী নয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যুৎ প্রকৌশলী মারিও তেরজিনো অভিযোগ করেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আগাম পরামর্শ বা আলোচনা করা হয়নি। সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে তারা বিষয়টি জানতে পেরেছেন। তার মতে, এই গণভোট মূলত সরকারের কাছে একটি সতর্কবার্তা যে স্থানীয় জনগণের মতামত উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ গ্রহণযোগ্য নয়।

গ্রামের অনেক বাসিন্দা নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক নতুন মানুষের আগমনে অপরাধ বাড়তে পারে অথবা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। যদিও তারা জোর দিয়ে বলেছেন, তাদের আপত্তি কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়; বরং পরিকল্পনার পরিসর এবং স্থান নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে।

বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে স্থানীয় প্রতিনিধিরা বন্ধ হয়ে যাওয়া আবাসিক বিদ্যালয়গুলোর মতো বড় অবকাঠামোকে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের জন্য ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের যুক্তি, সেখানে আবাসন, রান্নাঘর ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা আগে থেকেই রয়েছে।

স্থানীয় লিবারেল ডেমোক্র্যাট সংসদ সদস্য ক্যালাম মিলারও সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বাসিন্দাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্যারিশ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান টিম ম্যাকন্যালি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত প্রতীকী ভোটে ৯৬ শতাংশ গ্রামবাসী স্বাধীনতা গণভোটের পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, গণভোটে বিচ্ছেদের পক্ষে রায় এলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে গিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন এবং সমর্থন চাইবেন।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্থানীয় জনগণের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়েই সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলকভাবে সমানভাবে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। সরকারের দাবি, সাবেক সামরিক স্থাপনাগুলো ব্যবহার করার ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য হোটেলের ওপর নির্ভরতা কমছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ৩৫ শতাংশ কমেছে এবং আগের সরকারের সময়কার সর্বোচ্চ সংখ্যার তুলনায় তা ৬৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে আশ্রয়ব্যবস্থার ব্যয়ও প্রায় ১ বিলিয়ন পাউন্ড কমেছে।

আশ্রয়প্রার্থী পুনর্বাসন নীতি নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলমান বিতর্কের মধ্যে পিডিংটন গ্রামের এই প্রতীকী গণভোটের উদ্যোগ নতুন করে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি শুধু একটি গ্রামের ক্ষোভের প্রকাশ নয়, বরং অভিবাসন ও আশ্রয়নীতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক বিতর্ককেও আরও তীব্র করে তুলেছে।

সূত্রঃ দ্য সান

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভাঙলে নির্যাতনের প্রমাণে মিলতে পারে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি

ভাড়া সংকটে ইংল্যান্ডঃ ভাড়াটিয়াদের আয়ের ৩৬% চলে যাচ্ছে আবাসনে

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করা হবেঃ শাবানা মাহমুদ