TV3 BANGLA
মুক্তমত

কেন যুক্তরাষ্ট্র আইসিসিকে ধ্বংস করতে চায়

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) প্রতিষ্ঠার ধারণা যখন প্রথম সামনে আসে, তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করে আসছে। ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই রোম স্ট্যাটিউটের আলোচনায় ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তারা এমন কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের অংশ হবে না, যেখানে মার্কিন সেনা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর বিচারিক ক্ষমতা থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে আইসিসি ছিল তাদের বৈশ্বিক সামরিক ও কূটনৈতিক কার্যক্রমের ওপর এক ধরনের ‘বাধা’।

 

শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র কখনোই আইসিসির সদস্য না হওয়ায় মার্কিন সেনা, সিআইএ কর্মকর্তা, জেনারেল বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব-কেউই আইসিসির বিচারিক ক্ষমতার আওতায় পড়েনি। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত : বিশ্বের যে কোনো স্থানে সামরিক অভিযান চালানো যাবে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালতের সামনে জবাবদিহি করতে হবে না। এ দায়মুক্তির নীতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে।

আইসিসিকে ব্যবহার : বিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে বলকান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির ধারণাকে সমর্থন করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতকে ব্যবহার করে। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচ এবং বসনিয়ায় সার্বদের রাজনৈতিক নেতা রাদোভান কারাজিচের বিরুদ্ধে মামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, আইসিসিকে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছে, যখন তা তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিলেছে। কিন্তু যখনই স্বার্থ পরিপন্থি হয়েছে, তখনই এর বিরুদ্ধে গেছে। এখন যেমন ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির বিরুদ্ধে এক নতুন ধরনের আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করেছে। এর মূল কারণ আইসিসি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ইসরাইলি নেতৃত্বকে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে।

যে আদালতকে তারা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে, সেই আদালত যখন ইসরাইলের বিরুদ্ধে একই আইন প্রয়োগ করল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আইসিসি হয়ে উঠল ‘শত্রু’। বর্তমান মার্কিন নেতৃত্ব প্রকাশ্যেই বলছে যে, আইসিসি হলো মার্কিন সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। কেন তারা এই অবস্থান নিয়েছে? এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য : যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করা। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে যুক্তরাষ্ট্র এখন বুঝতে পেরেছে যে, এটি আদৌ শুরু করাই ঠিক হয়নি।

 

গণহত্যাবিরোধী কনভেনশন, জেনেভা কনভেনশন-এসব আন্তর্জাতিক আইন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নীতিতেই রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে : আন্তর্জাতিক আইন কি কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়?

ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণে এ দ্বৈত মানদণ্ড স্পষ্ট। ইরান হরমুজ প্রণালিতে ফি নিতে পারে না-এ যুক্তি দিতে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও নিজেই আন্তর্জাতিক আইনকে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু একই আইন যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হয়, তখন তা তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক আইনকে সুবিধামতো অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা-এটাই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের প্রবণতা।

আইসিসি নিয়ে রুবিওর আরেকটি অভিযোগ-এটি নাকি ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর দ্বারা পরিচালিত’। অথচ বাস্তবে আইসিসির ১২৫ সদস্যের বেশির ভাগই ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বরং যেসব দেশ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তারাই আইসিসিতে যোগ দিতে ভয় পায়। কারণ সদস্য হলে তাদের কর্মকর্তারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন।

আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আপত্তি আইসিসির ভূখণ্ডগত এখতিয়ার অর্থাৎ সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা। এ ক্ষমতা ব্যবহার করে আইসিসি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। রাশিয়া সদস্য না হলেও ইউক্রেন সদস্য এবং অপরাধ ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ঘটেছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির এ ক্ষমতাকে সমর্থন করেছে। আইসিসি ভূখণ্ডগত এখতিয়ার ব্যবহার করে ১৭ মার্চ ২০২৩ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।

 

কেন আইসিসির এখতিয়ার ছিল? রাশিয়া আইসিসির সদস্য নয়। কিন্তু ইউক্রেন ২০১৪ ও ২০১৫ সালে আইসিসিকে তার ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার অনুমতি দেয়। ইউক্রেনের অভিযোগ ছিল, তাদের ভূখণ্ড থেকে রাশিয়ার শিশুদের অপহরণ ও জোরপূর্বক স্থানান্তর। অপরাধ ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ঘটায় আইসিসির ভূখণ্ডগত এখতিয়ার কার্যকর হয়। পুতিনের বিরুদ্ধে আইসিসির এ পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। ওই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছিলেন, অভিযোগগুলো যৌক্তিক। মার্কিন সিনেট সর্বসম্মতভাবে আইসিসি এ পদক্ষেপকে সমর্থন করে। অর্থাৎ, যখন আইসিসির ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে মিলে যায়, তখন তারা আদালতকে সমর্থন করে।

পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায় ২০২৪ সালের ২০ মে, যখন আইসিসি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা চায়। এক্ষেত্রে কেন আইসিসির এখতিয়ার ছিল? ইসরাইল আইসিসির সদস্য নয়। কিন্তু ফিলিস্তিন ২০১৫ সালে সংস্থাটির সদস্য হয়। ইসরাইলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার উপাদান রয়েছে। আর অপরাধটি ঘটেছে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে। কাজেই আইসিসির ভূখণ্ডগত এখতিয়ার এখানে কার্যকর। কিন্তু এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুরোপুরি বদলে যায়। বাইডেন প্রশাসন আইসিসির পদক্ষেপকে বাড়াবাড়ি হিসাবে অভিহিত করেন। আর মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘আমরা অবশ্যই আইসিসিকে ধ্বংস করে দেব।’ অর্থাৎ, একই আইন যখন পুতিনের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। কিন্তু যখন ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র আইসিসিকে ধ্বংস করতে চায়।

 

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ভয় আরও গভীর। আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে-যদি তারা বিদেশে যুদ্ধাপরাধ করে, অন্য দেশের গণহত্যায় সহায়তা করে, আইসিসির বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে। ট্রাম্প আইসিসি কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন, যা আইসিসির আইনে নিজেই অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।

এখন রুবিও নতুন করে আইসিসির বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক নীতি ঘোষণা করেছেন-নতুন নিষেধাজ্ঞা, আইসিসিকে সহযোগিতা করা দেশগুলোর ওপর চাপ এবং আদালতকে দুর্বল করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। এর আড়ালে লুকিয়ে আছে একটাই উদ্দেশ্য : যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে রক্ষা করা।

যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির অংশ নয়-এটি সত্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আইসিসিকে ব্যবহার করেছে যখন তা তাদের স্বার্থে ছিল। এবং এখন আইসিসি ইসরাইল ও সম্ভাব্যভাবে মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্র আদালতটিকে ধ্বংস করতে চায়। এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন নয়-এটি দায়মুক্তির রাজনীতি। যেখানে আন্তর্জাতিক আইনকে মানা হয় সুবিধামতো, আর অমান্য করা হয় যখন তা নিজের বিরুদ্ধে যায়।

বিশ্ব যখন যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা চায়, তখন আইসিসিকে দুর্বল করার এ প্রচেষ্টা মানবাধিকার রক্ষার ভবিষ্যতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। আইসিসির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের এ যুদ্ধ ঘোষণা আসলে আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু করা এ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে মানবাধিকার রক্ষার বৈশ্বিক কাঠামো কতটা যুক্তিসংগত ও কার্যকর থাকবে।

নাশিত রহমান : গবেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

 

সূত্র: যুগান্তর

 

আরো পড়ুন

‘বরিস জনসনকে ক্ষমা করা হবে না’: গ্লোভার

নিউজ ডেস্ক

প্রপার্টি রিপোজেশন – Property Repossession

অনলাইন ডেস্ক

গ্রেট ব্রিটেন ব্যাংকগুলোতে আপনার টাকা কতটা নিরাপদ