বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন থাকা আওয়ামী লীগ বর্তমানে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নির্বাহী আদেশে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার মধ্যে এবার নতুন করে সামনে এসেছে—শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কে থাকবেন, সেই প্রশ্ন। আর এই আলোচনায় শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাম সামনে আসতেই দলটির ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, তার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের একাংশের মধ্যেও এ নিয়ে হতাশা ও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যের সময়টিও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি এর আগে আগামী ডিসেম্বর দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাব্য মুখ হিসেবে তুলে ধরছিলেন।
শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আপন ভাগ্নে এবং শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই। শেখ সেলিমের বড় ভাই শেখ ফজলুল হক মণি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত হন।
দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে শেখ সেলিমের অবস্থান বর্তমানে তৃতীয়। তার আগে থাকা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও মতিয়া চৌধুরী মারা গেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাকে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। দলীয় সূত্রের দাবি, তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
শেখ সেলিম ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। এর আগে ও পরে দলের যুব সংগঠন যুবলীগের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গোপালগঞ্জ থেকে তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সব মিলিয়ে আটবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর শেখ সেলিমকে আটক করা হয়েছিল। সে সময় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের একটি ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মামলা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে দায়ের করা নতুন একটি মামলায় শেখ হাসিনা ও শেখ সেলিমসহ বেশ কয়েকজনকে আসামির তালিকায় রাখা হয়।
২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনার সময় শেখ সেলিমের বনানীর বাসায়ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ১ মার্চ জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে শেখ সেলিমের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। চলতি মাসের শুরুতে দুদক জানায়, শেখ সেলিমের নামে প্রায় ৩৬ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ও অতিরিক্ত সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।
তবে শেখ সেলিমকে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা সরাসরি মনোনীত করেছেন—বিষয়টি এমন নয় বলে দাবি করেছেন দলটির মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
তার ব্যাখ্যা, শেখ হাসিনা মূলত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ও গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন। দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা মারা গেছেন কিংবা কারাগারে থাকায় শেখ সেলিম বর্তমানে জ্যেষ্ঠতম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে বিভিন্ন দলীয় সভায় সভাপতিত্ব করছেন।
মোহাম্মদ আলী আরাফাতের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের নেতা কে হবেন, তা শেষ পর্যন্ত দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। সজীব ওয়াজেদ জয়ের ক্ষেত্রেও দলের ভবিষ্যৎ ভূমিকা কাউন্সিলেই নির্ধারিত হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
শেখ সেলিমের নাম সামনে আসার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে পুরোনো একটি প্রশ্ন আবারও জোরালো হয়েছে—দলটি কি শেখ পরিবারের নেতৃত্বের বাইরে গিয়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মজিবর রহমান চৌধুরীর মতে, শেখ সেলিম আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত ও দীর্ঘদিনের নেতা হলেও বর্তমান সময় ও নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তার নাম পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তার মতে, বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের চর্চা দীর্ঘদিনের। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘নতুন সময়ের দরকার নতুন মানুষ ও নতুন আইডিয়া। আমাদের উচিত নতুন প্রজন্মের হাতে ব্যাটন তুলে দেওয়া।’
সব মিলিয়ে শেখ সেলিমকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নটিকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে দলীয় গঠনতন্ত্র ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে শেখ সেলিমের নাম উঠে আসছে, অন্যদিকে দলের একটি অংশ নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের দাবি তুলছে।
এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বেদখল হয়ে যাওয়া এবং শীর্ষ নেতাদের অনেকে দেশে অনুপস্থিত বা বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি দলটির সামনে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত শেখ পরিবারের মধ্যেই থাকবে, নাকি দলটি নতুন প্রজন্ম ও নতুন নেতৃত্বের দিকে যাবে—সেটিই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত প্রশ্ন।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
এম.কে

