বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি এক বেসামরিক-সামরিক পরিকল্পনা কাজ করেছে—এমন চাঞ্চল্যকর দাবি উঠেছে সম্প্রতি ফাঁস হওয়া কিছু নথিতে। এসব নথির ভিত্তিতে তৈরি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই এই পরিকল্পনার সূচনা এবং বাস্তবায়ন হয়েছে।
নথিতে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘কোয়াড’ জোটে যোগ দিতে অস্বীকৃতি এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই এই পরিকল্পনার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘন ঘন ঢাকা সফরকে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোপন বৈঠক ও পরিকল্পনার রূপরেখা
ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় তৎকালীন এক মার্কিন কূটনীতিকের বাসভবন এবং নেপালের একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে বিদেশি কূটনীতিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশের কয়েকজন নাগরিক অংশ নেন, যাদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭-০৮ সালের অসমাপ্ত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি, অরাজনৈতিক ও অনুগত সরকার গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এতে বিদেশি কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক, সামরিক-বেসামরিক যোগাযোগ এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও ‘বয়ান তৈরির’ অভিযোগঃ
নথিতে আরও দাবি করা হয়েছে, সরকার পরিবর্তনের কৌশলের অংশ হিসেবে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের একটি অংশকে ব্যবহার করা হয়। জনমত গঠন এবং রাজনৈতিক বয়ান তৈরির জন্য দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করা হয়।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, সরকারের অভ্যন্তরীণ তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের জন্য নাঈমুল ইসলাম খানকে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নির্দিষ্ট মহলে পৌঁছে দিতেন।
একই সঙ্গে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ প্রচারে কিছু মানবাধিকার সংগঠন সক্রিয় ভূমিকা রাখে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ ও সরকারবিরোধী ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও কৌশলগত চাপ
বিশ্লেষণে বলা হয়, পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ানোর পর বাংলাদেশ চীন, রাশিয়া ও জাপানের সঙ্গে বড় অবকাঠামোগত সহযোগিতা জোরদার করে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্বেগ বাড়ে।
নথিতে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত করতে চাইলেও সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। এর প্রেক্ষিতে বিকল্প কৌশল হিসেবে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হয়।
এছাড়া রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
সামরিক-বেসামরিক যোগসূত্র ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকাঃ
নথিতে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকাও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয় তিনি অতীতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং এই পটপরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
একই সঙ্গে জাতিসংঘের আওতায় সামরিক ঘাঁটি ও মানবিক করিডোর স্থাপনের প্রস্তাবের কথাও উঠে এসেছে, যা নিয়ে সামরিক বাহিনীর ভেতরে মতবিরোধ তৈরি হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা
প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের কৌশলগত মনোযোগ বাড়াতে পারে এবং বাংলাদেশকে সামরিক সহযোগিতা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে পারে।
তবে ফাঁস হওয়া এসব নথিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়গুলোকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্রঃ আজকের কন্ঠ
এম.কে

