যুক্তরাজ্যে সম্ভাব্য ভয়াবহ আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় নাগরিকদের ঘরে কয়েক দিনের খাদ্য ও পানি মজুত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা ঈগল। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বা পানির সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি সেবা পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত নিজেদের সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি নিতে ব্রিটিশ পরিবারগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই সতর্কতার পেছনে রয়েছে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনো অন্তত গত এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানল, বন্যা, খরা ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো—আগামী শীত স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপ্রবণ ও ঝড়ো হতে পারে।
অ্যাঞ্জেলা ঈগল বলেছেন, যুক্তরাজ্য সম্ভবত এখন পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে বড় এল নিনোর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। এর ফলে দেশটিতে আরও শুষ্ক গ্রীষ্ম, বেশি বৃষ্টিপাতপূর্ণ শীত এবং শক্তিশালী ঝড়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ কারণে ঘরে কিছু খাদ্য মজুত রাখাকে তিনি জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, জরুরি সেবা পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগলে ঘরে থাকা সামান্য খাদ্যও মানুষকে সেই সময় পার করতে সহায়তা করবে। তার মতে, নাগরিকদের নিজেদের আরও ‘সহনশীল’ ও প্রস্তুত করে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যার ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের সঙ্গে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে চলে আসে। এই পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এল নিনোর কেন্দ্রীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩০ বছরের গড়ের চেয়ে ইতোমধ্যে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। ২০১৫ সালে উপগ্রহভিত্তিক তথ্যের যুগে সর্বোচ্চ অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি এখনও চূড়ায় পৌঁছায়নি।
বিভিন্ন আবহাওয়া মডেলের গড় পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী নভেম্বর নাগাদ এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। জলবায়ু বিশ্লেষক জেকে হাউসফাদারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রবাল, গাছের বলয় ও ঐতিহাসিক নথির তথ্য বলছে—গত এক হাজার বছরে কোনো এল নিনো এত শক্তিশালী হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, এল নিনো ‘চোখের সামনে আরও বড় আকার ধারণ করছে’। তার মতে, পৃথিবী এমন এক অচেনা জলবায়ু পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলোও সতর্ক করেছেন, শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। ইতোমধ্যে খরা ও বন্যার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে এবং এল নিনো আরও শক্তিশালী হলে এসব প্রভাব বাড়তে পারে।
জলবায়ু সংকটের সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপে রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহের পর এখন নতুন করে চরম আবহাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউরোপের সাম্প্রতিক ভয়াবহ তাপপ্রবাহের সঙ্গে অন্তত ৩৫ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
এল নিনোর প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে এবং ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সামনে অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের ঝুঁকি এবং দক্ষিণ আমেরিকায় আরও তীব্র বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিও সতর্ক করেছে যে এল নিনোর কারণে আগামী বছর প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন। অর্থাৎ এর প্রভাব শুধু আবহাওয়া বা পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; খাদ্য সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য সরকার জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদার করছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভা দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি প্রচারাভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পরিবারগুলোকে টিনজাত খাবারসহ প্রয়োজনীয় খাদ্য মজুত রাখা এবং জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হবে।
পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা ঈগল নতুন জলাধার নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
হ্যাম্পশায়ারের হ্যাভান্ট থিকেট এলাকায় নির্মাণাধীন জলাধারটি ১৯৯২ সালের পর যুক্তরাজ্যের প্রথম নতুন জলাধার হতে যাচ্ছে। ঈগলের দাবি, ভবিষ্যতের চরম আবহাওয়া মোকাবিলায় পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে এ ধরনের প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার একই সঙ্গে কৃষি ব্যবস্থাকে আরও টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল করার পরিকল্পনা করছে। পরিবেশমন্ত্রী মনে করছেন, ভবিষ্যতের অনিশ্চিত আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় এখনই পরিবর্তন আনা না হলে ব্রিটেনকে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

