TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

স্পনসরশিপ ছাড়াই গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসাঃ সহজ হচ্ছে ব্রিটেনে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের প্রবেশ

 

ব্রিটেনে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক পেশাজীবীদের নিয়োগে বড় পরিবর্তন এসেছে। নতুন অভিবাসন বিধির আওতায় গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার পরিধি বাড়িয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবননির্ভর আরও বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এর আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে নকশা ও ডিজাইন খাতের পেশাজীবীদের জন্য চালু হয়েছে নতুন একটি স্বতন্ত্র পথ। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সম্প্রসারণের লক্ষ্য হলো বিশ্বের সেরা প্রতিভাবান গবেষক ও পেশাজীবীদের ব্রিটেনে আকৃষ্ট করে অর্থনীতি, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে আরও শক্তিশালী করা।

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যোগ্য আবেদনকারীর জন্য প্রচলিত নিয়োগকর্তা-স্পনসরশিপ বাধ্যতামূলক নয়। গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসায় একজন দক্ষ পেশাজীবী নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের স্পনসরশিপের ওপর নির্ভর না করেই নিজের যোগ্যতা ও পেশাগত স্বীকৃতির ভিত্তিতে ব্রিটেনে কাজের অনুমতি পেতে পারেন। সরকারি নির্দেশনায় বিজ্ঞান, প্রকৌশল, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান, চিকিৎসা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং শিল্প ও সংস্কৃতির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রকে এই ব্যবস্থার আওতায় রাখা হয়েছে।

গবেষণা খাতে পরিবর্তনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্য গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থা অনুমোদিত অর্থদাতাদের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার দ্রুততর অনুমোদন ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে যুক্তরাজ্যের অনুমোদিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে বা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে এবং অনুমোদিত অর্থদাতার গবেষণা অনুদান বা পুরস্কারের সঙ্গে তার ভূমিকার যোগসূত্র থাকতে হবে।

২০২৬ সালে এই ব্যবস্থার আওতা আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসায় প্রায় ১০০টি গবেষণা ও উন্নয়ননির্ভর ব্যবসা যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির শিল্পখাত, উন্নত উৎপাদন এবং ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এ পরিবর্তনের ফলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত স্পনসরশিপ ব্যবস্থার ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভর করতে পারবে। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও আন্তর্জাতিক প্রতিভা আকর্ষণের সুযোগ বাড়তে পারে, কারণ নিয়োগকর্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি স্পনসরশিপ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক দায় কমে যায়।

অন্যদিকে, ডিজাইন খাতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার আওতায় আলাদা ডিজাইন ইন্ডাস্ট্রি পথ চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে আগে প্রচলিত শিল্প ও সংস্কৃতি শ্রেণির সঙ্গে সহজে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না—এমন বিভিন্ন পেশার ডিজাইনারদের জন্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হয়েছে। পণ্য নকশা, শিল্প নকশা, ডিজিটাল পণ্য নকশা, ব্যবহারকারী অভিজ্ঞতা ও ব্যবহারকারী ইন্টারফেস নকশার মতো ক্ষেত্র এতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এই নতুন পথের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আবেদনকারীর যোগ্যতা মূলত তার নিজের পেশাগত সক্ষমতা, সাফল্য ও স্বীকৃতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের চাকরির প্রস্তাব পাওয়াই ভিসার একমাত্র ভিত্তি নয়। সরকারি নির্দেশনায়ও গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসাকে এমন ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে, যারা নিজেদের ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভা বা সম্ভাবনাময় নেতৃত্বের সক্ষমতা দেখাতে পারেন।

তবে নতুন ব্যবস্থা সহজ মানেই আবেদন প্রক্রিয়া সহজ নয়। আবেদনকারীকে নিজের পেশাগত অবস্থান ও অবদানের পক্ষে শক্ত প্রমাণ দিতে হবে। গবেষণা খাতে গবেষণা অনুদান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করা হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে পেশাগত স্বীকৃতি, কাজের প্রভাব, অর্জন এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শিল্প ও সংস্কৃতি খাতের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে আর্টস কাউন্সিল ইংল্যান্ড অনুমোদনকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারীকে তার ক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি অথবা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়। নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পুরস্কার থাকলে আলাদা অনুমোদন ছাড়াও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন ব্রিটেনের কর্মী নিয়োগের প্রচলিত ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। আগে যেখানে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে স্পনসর হিসেবে দায়িত্ব নিতে হতো, সেখানে নতুন ব্যবস্থায় যোগ্য ব্যক্তির দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে গবেষণা, প্রযুক্তি ও সৃজনশীল শিল্পে বিশ্বব্যাপী প্রতিভাবান কর্মীদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।

তবে এর সুবিধা মূলত তাদের জন্যই, যারা কঠোর যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম। শুধু চাকরির অভিজ্ঞতা বা ব্রিটেনে কাজ করার আগ্রহ থাকলেই গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসা পাওয়া যাবে না। আবেদনকারীকে নিজের ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভা বা সম্ভাবনার যথেষ্ট প্রমাণ দেখাতে হবে।

সব মিলিয়ে, গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসার এই সম্প্রসারণ ব্রিটেনের অভিবাসন নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপের পরিবর্তে ব্যক্তির দক্ষতা, গবেষণা ও পেশাগত অর্জনকে সামনে এনে ব্রিটেন এখন আন্তর্জাতিক প্রতিভা আকর্ষণের নতুন মডেল তৈরি করছে। গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি নতুন ডিজাইন পথ চালুর ফলে সৃজনশীল শিল্পেও এর প্রভাব পড়তে পারে। সরকারের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ব্রিটেনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে এবং উচ্চ দক্ষতার আন্তর্জাতিক কর্মীদের মাধ্যমে নতুন গবেষণা, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

সূত্রঃ গভ.ইউকে

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রেক্সিট নিয়ে বদলাচ্ছে জনমতঃ লন্ডনের ৬৭% চান ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগ দিক যুক্তরাজ্য

বিলেতে বাড়ি কেনাবেচা: মর্গেজ কি এবং কিভাবে করতে হয়?

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে ২০২৪ অর্থবছরে চাকুরী হারিয়েছেন প্রায় দুই লাখের বেশি মানুষ