পশ্চিম লন্ডনে অচেতন অবস্থায় পাওয়া এক নারীকে ধর্ষণের পর তার অ্যাম্বুলেন্স অনুসরণ করে হাসপাতালে যাওয়ার ঘটনায় সালেম রেকুব নামে ২৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। জুরি তাকে তিনটি ধর্ষণ এবং নারীকে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের দুটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। আইলওয়ার্থ ক্রাউন কোর্টে শুনানিতে বলা হয়, ৪০-এর কোঠায় বয়সী ওই নারী বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন। অসুস্থ বোধ করায় তিনি নির্ধারিত গন্তব্যের আগেই বাস থেকে নেমে যান। পরে পশ্চিম লন্ডনের একটি বাসস্টপে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
আদালতকে জানানো হয়, ওই সময় রেকুব তাকে দেখতে পায়। সে তার ডেলিভারি বাইক দেয়ালের পাশে রেখে নারীকে জনসমাগম থেকে দূরে একটি পাশের সড়কে টেনে নিয়ে যায়। পরে পার্ক করা গাড়ির মাঝের একটি ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে তার ওপর যৌন হামলা চালায়। প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার সময় নারীটি বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন এবং জ্ঞান ফিরে পাচ্ছিলেন।
হামলাটি প্রায় ১৭ মিনিট ধরে চলে এবং ওই নারীর শরীরে ৩৩টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। আদালতে বলা হয়, রেকুব তাকে বারবার চুপ থাকতে বলেছিল।
হামলার পর রেকুব জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে। তবে প্রসিকিউশন জানায়, সে জরুরি সেবাকর্মীদের কাছে ঘটনার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দেয়। একজন প্যারামেডিককে সে দাবি করে, ওই নারী অতিরিক্ত মদ্যপান করেছিলেন। পরে পুলিশকেও নিজের আসল পরিচয় না দিয়ে ভুয়া নাম ব্যবহার করে এবং নিজেকে একজন উদ্বিগ্ন পথচারী হিসেবে উপস্থাপন করে।
এরপর ওই নারীকে যে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল, রেকুব সেটিও অনুসরণ করে চেলসি অ্যান্ড ওয়েস্টমিনস্টার হাসপাতালে যায়। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে তাকে করিডোর দিয়ে হাঁটতে এবং ট্রায়াজ ও চিকিৎসা কক্ষগুলোর ভেতরে উঁকি দিতে দেখা যায়। সে ওই নারীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিল।
হাসপাতালের এক কর্মী তাকে প্রশ্ন করলে রেকুব জানায়, সে সেখানে একজনকে খুঁজতে এসেছে। পরে ওই নারী প্যারামেডিকদের কাছে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল তা জানাতে সক্ষম হন। ঘটনার নয় দিন পর রেকুবকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালতে পড়ে শোনানো ভিকটিম ইমপ্যাক্ট স্টেটমেন্টে ওই নারী জানান, হামলার পর তার জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, ঘটনাটি তার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে এবং তিনি নিজেকে আর আগের মানুষ হিসেবে মনে করেন না। তিনি আরও জানান, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ভয় ও মানসিক সংকটের মধ্যে ছিলেন এবং এক পর্যায়ে নিজের জীবন নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
আদালতকে আরও জানানো হয়, ঘটনার পর ওই নারী খিঁচুনিতে ভুগেছেন এবং মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসাকেন্দ্রেও সময় কাটিয়েছেন।
রেকুব ২০২৩ সালে পর্যটন ভিসায় ব্রিটেনে এসেছিল এবং যুক্তরাজ্যে কাজ করার বৈধ অনুমতি তার ছিল না। আদালতে তার আইনজীবী জানান, রেকুব আগে একজন সম্ভাবনাময় ফুটবলার ছিল এবং আলজেরিয়া জাতীয় দলে খেলার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে হাঁটুর চোটের কারণে তার ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়।
রেকুবের ডেলিভারি কাজের বিষয়টিও মামলার শুনানিতে উঠে আসে। প্রসিকিউশন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সে বৈধভাবে কাজ করার অধিকার না থাকা সত্ত্বেও খাদ্য সরবরাহের কাজ করছিল। লন্ডন স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে ডেলিভারু প্ল্যাটফর্মের যাচাইকৃত রাইডার ছিল না এবং তার কাজের অনুমতি সংক্রান্ত যাচাইয়ে ঘাটতি ছিল বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেলিভারুর একজন মুখপাত্র জানান, এই অপরাধে কোম্পানি স্তম্ভিত এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছে। কোম্পানির বক্তব্য অনুযায়ী, রেকুব তাদের প্ল্যাটফর্মের যাচাইকৃত রাইডার ছিল না; বরং সে তাদের সিস্টেমের অপব্যবহার করে অবৈধভাবে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করেছিল।
ডেলিভারু আরও জানিয়েছে, ঘটনার পর প্ল্যাটফর্মে কারা প্রবেশাধিকার পাবে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে এবং এ ধরনের অপব্যবহার ঠেকাতে কোম্পানি বিনিয়োগ অব্যাহত রাখছে।
মামলার বিচার শেষে জুরি রেকুবকে তিনটি ধর্ষণ এবং দুটি অনুপ্রবেশের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। এরপর আদালত তাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দেন।
সূত্রঃ লন্ডন স্ট্যান্ডার্ড \ দ্য সান
এমকে

