TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

অভিবাসী আতঙ্কে উত্তাল যুক্তরাজ্যঃ স্কুলছাত্রীদের হয়রানির অভিযোগ, পাহারায় নিরাপত্তারক্ষী

ব্রিটেনের এসেক্সে আশ্রয়প্রার্থীদের উপস্থিতি ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগের পর তিনটি শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করেছে রিফর্ম ইউকে-নিয়ন্ত্রিত এসেক্স কাউন্টি কাউন্সিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরুষ আশ্রয়প্রার্থীদের দলবদ্ধ উপস্থিতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং স্কুলছাত্রীদের উদ্দেশে শিস দেওয়ার ঘটনায় শহরকেন্দ্রে নারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

সোমবার থেকে ব্রেইনট্রি, কোলচেস্টার ও চেলমসফোর্ড শহরকেন্দ্রে ছয়জন প্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষী টহল দেওয়া শুরু করেছেন। প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য চালু করা এই কার্যক্রমের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ভ্যানগার্ড’।

কাউন্সিল জানিয়েছে, নিরাপত্তারক্ষীরা সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত সপ্তাহে সাত দিন দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে অসামাজিক আচরণ প্রতিরোধ, স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করা এবং ভবিষ্যতে আরও নিরাপত্তা সহায়তার প্রয়োজন আছে কি না সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা।

এই উদ্যোগের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার পাউন্ড, এর সঙ্গে মূল্য সংযোজন কর। রিফর্ম ইউকে জানিয়েছে, কমিউনিটি ইমপ্রুভমেন্ট ফান্ড থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ ব্যবহার করা হবে।

এসেক্স কাউন্টি কাউন্সিলের রিফর্ম ইউকে নেতা পিটার হ্যারিস বলেছেন, ‘অপারেশন ভ্যানগার্ড’ এখন বক্তব্য থেকে বাস্তব পদক্ষেপে পরিণত হয়েছে। তার ভাষ্য, ব্রেইনট্রি, কোলচেস্টার ও চেলমসফোর্ডে দুইজন করে নিরাপত্তারক্ষী দৃশ্যমান উপস্থিতি নিশ্চিত করবেন, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে।

ঘটনার পেছনে ওয়েদারসফিল্ডের সাবেক রয়্যাল এয়ার ফোর্স ঘাঁটিতে আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৮০০ আশ্রয়প্রার্থী অবস্থান করছেন। সরকার তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে ১ হাজার ২৪৫ করার পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের পরও ওই স্থাপনা আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ওয়েদারসফিল্ডে অবস্থানরত আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়মিত মিনিবাসে করে আশপাশের শহরগুলোতে কেনাকাটা ও বিভিন্ন সেবা নেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। ব্রেইনট্রি ওই কেন্দ্র থেকে প্রায় সাত মাইল দূরে।

স্থানীয় বাসিন্দা ৬৬ বছর বয়সী মাইক রিডন দাবি করেছেন, সকালে বাসভর্তি করে আশ্রয়প্রার্থীদের শহরে নামিয়ে দেওয়ার পর তাদের অনেকে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থান করেন। তার অভিযোগ, স্কুল থেকে বাসে নামা মেয়েদের উদ্দেশে তারা শিস দেন।

রিডনের ভাষ্য, পরিস্থিতির কারণে তার স্ত্রী ও তার বন্ধুরা বৃহস্পতিবার একা শহরে যেতে চান না।

তবে স্থানীয় পুলিশ এই পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখছে। এসেক্স পুলিশের নতুন প্রধান কনস্টেবল র‌্যাচেল নোলান বিবিসি লুক ইস্টকে বলেছেন, ওয়েদারসফিল্ডের আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের মাত্রা ‘খুবই কম’। তিনি বলেন, ওই কেন্দ্রের আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ নিয়ে মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ তিনি দেখছেন না।

কাউন্সিলের নিজস্ব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোম অফিসের দাবি অনুযায়ী ওয়েদারসফিল্ড বিমানঘাঁটিতে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের কারণে স্থানীয় অপরাধের মাত্রায় কোনো প্রভাব পড়ার প্রমাণ নেই। তবে একই প্রতিবেদনে স্থানীয়দের মধ্যে ভয় এবং অপরাধের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা তৈরির ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক’ তথ্য থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন বিরোধী কাউন্সিলররা। লেবার পার্টির কাউন্সিলর লি স্কর্ডিস বলেছেন, সিদ্ধান্তটি পক্ষপাতমূলক মনোভাব থেকে নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, কোলচেস্টারে আশ্রয়প্রার্থীদের কারণে অপরাধ বৃদ্ধির কোনো প্রমাণ কাউন্সিলের নিজস্ব প্রতিবেদন বা পুলিশের কাছে নেই।

তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, নিরাপত্তারক্ষীদের কী ক্ষমতা থাকবে এবং কাউন্সিল তাদের নিয়োগের আগে পুলিশের সঙ্গে পরামর্শ করেছে কি না।

বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীদের কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা নেই। কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটলে তা স্থানীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

লিবারেল ডেমোক্র্যাট কাউন্সিলর ও চেলমসফোর্ড সিটি কাউন্সিলের নেতা স্টিফেন রবিনসনও এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হলেও আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়ে ভয় ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে পরিস্থিতির সমাধান হবে না।

এদিকে ওয়েদারসফিল্ডকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। রিফর্ম ইউকে নেতা পিটার হ্যারিস এর আগে কেন্দ্রটিকে ‘ছুটির শিবির’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী সেখানে জিম, ফিটনেস স্টুডিও, পূর্ণ আকারের ফুটবল মাঠ, ইনডোর স্পোর্টস হল, টেলিভিশন কক্ষ ও পুল টেবিলসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওয়েদারসফিল্ডে থাকা ২৫ বছর বয়সী এক আশ্রয়প্রার্থী আদনানি মোহাম্মদকে এ বছরের শুরুতে মদ্যপ অবস্থায় কর্মীদের ওপর সহিংস হামলার ঘটনায় ১৫০ ঘণ্টা বিনা পারিশ্রমিকে সামাজিক কাজের সাজা দেওয়া হয়েছিল।

তবে ওয়েদারসফিল্ড কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো গুরুতর অপরাধের জন্য শহরে কারও দণ্ডিত হওয়ার নির্দিষ্ট রেকর্ড নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন নারীর ওপর হামলার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, নিজেদের ‘অডিটর’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া কট্টর ডানপন্থী বিক্ষোভকারীরাও আশ্রয়প্রার্থীদের উদ্দেশে গালিগালাজ করছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা দুই পক্ষের উত্তেজনার মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন।

হোম অফিসের এক মুখপাত্র বলেছেন, জননিরাপত্তা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কোনো অপরাধ হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা হবে। স্থানীয় জনগণ, কেন্দ্রের কর্মী এবং সেখানে অবস্থানরত আশ্রয়প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোম অফিস স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে কাজ করছে বলেও জানানো হয়েছে।

হোম অফিস আরও জানিয়েছে, স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ সরকারের অভিবাসন সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকার সব আশ্রয়প্রার্থী হোটেল বন্ধ করে সাবেক সামরিক স্থাপনাসহ বিকল্প আবাসনে আশ্রয়প্রার্থীদের স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে।

এদিকে অক্সফোর্ডশায়ারের পিডিংটন গ্রামেও আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন নিয়ে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩৫০ বাসিন্দার ওই গ্রামের মানুষ মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একটি প্রতীকী ‘গণভোটে’ অংশ নেবেন।

তবে এই ভোটের কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং ফলাফল বাধ্যতামূলক হবে না।

গ্রামটির কাছে সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি স্থাপনাকে আগামী ১০ বছর পর্যন্ত অনিবন্ধিত পুরুষ অভিবাসীদের আবাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের সরকারি পরিকল্পনার বিরোধিতা করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পিডিংটনের ১৩৩ জন নারী গত সপ্তাহে সব নারী সংসদ সদস্যের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি অনলাইন ভিডিও দুই মিলিয়নেরও বেশি বার দেখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পিডিংটনে প্রায় ১ হাজার ২৫০ আশ্রয়প্রার্থীকে আবাসনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি গ্রামের খুব কাছেই হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

৬১ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা পলা সিনিয়র বলেন, তিন বছর আগে তিনি ও তার স্বামী শান্তিপূর্ণ জীবন কাটানোর আশায় ওই গ্রামে অবসরজীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি তাদের বাড়ির বাগান থেকে মাত্র ৬৫০ গজ দূরে হওয়ায় তিনি এখন রাতে ঘুমাতে পারছেন না বলে দাবি করেন।

মঙ্গলবার পিডিংটনের ভোট গ্রহণের পর সন্ধ্যায় ভোট গণনা করা হবে এবং বুধবার সকাল ৭টায় ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। এর এক দিন পর প্রকল্পটি নিয়ে সরকারি পরামর্শ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা।

ব্রিটেন সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য হোটেল ব্যবহারের ব্যবস্থা বন্ধ করে সাবেক সামরিক স্থাপনাগুলো ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে। ওয়েদারসফিল্ড ও ইস্ট সাসেক্সের ক্রোবোরোতে ইতোমধ্যে এমন দুটি কেন্দ্র চালু রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, পিডিংটনের মতো মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত এলাকাগুলোকেও আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।

সূত্রঃ ডেইলি মেইল

এম.কে

আরো পড়ুন

হিথ্রোতে আর থাকছে না বাধ্যতামূলক মাস্ক পরার আইন

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে এ মাসে কার্যকর হওয়া নতুন আইনগুলো

অনলাইন ডেস্ক

লেবার পার্টি লিঙ্গ পরিবর্তন সহজ করার পরিকল্পনা বাতিল করল