21.8 C
London
September 19, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

‘আগুন নিয়ে খেলছে লন্ডন-প্যারিস’, সংঘাতের শঙ্কায় মস্কোয় সিআইএ প্রধানের গোপন সফর

ইউক্রেনকে ব্রিটিশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূরপাল্লার স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। মস্কো অভিযোগ করেছে, লন্ডন ও প্যারিস ইউক্রেনকে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ‘আগুন নিয়ে খেলছে’। একই সঙ্গে ইউক্রেন ব্রিটিশ অস্ত্র ব্যবহার করে রুশ ভূখণ্ডে হামলা চালালে যুক্তরাজ্যের সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জাম সম্ভাব্য পাল্টা হামলার লক্ষ্য হতে পারে বলে সতর্ক করেছে রাশিয়া।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়ে যুক্তরাজ্য সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের হাতে ব্রিটিশ সরবরাহ করা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে রাশিয়া ইউক্রেনের ভেতরে এবং এর বাইরে ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জামকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

ব্রিটিশ জনগণের উদ্দেশেও সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাখারোভা। তিনি বলেন, ব্রিটিশ সরকারের ‘শত্রুতাপূর্ণ পদক্ষেপের’ পরিণতি ‘বিপর্যয়কর’ হতে পারে। মস্কোর এই বক্তব্যে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য ন্যাটো সদস্যের নিরাপত্তায় সরাসরি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। তবে রাশিয়া এখনো যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি এবং ব্রিটেনে কোনো হামলা আসন্ন—এমন নিশ্চিত প্রমাণও প্রকাশ্যে নেই।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফের আকস্মিক মস্কো সফর নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, র‍্যাটক্লিফ রুশ কর্মকর্তাদের ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের বিরুদ্ধে হামলা বা সংঘাত আরও বিস্তৃত করা থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সতর্ক করতে মস্কো গিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে বাল্টিক অঞ্চলের এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআরের প্রধান সের্গেই নারিশকিনও র‍্যাটক্লিফের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ওই বৈঠককে তিনি ‘কর্মপর্যায়ের’ বৈঠক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জানান, সেখানে গোয়েন্দা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে র‍্যাটক্লিফের সরাসরি বৈঠক হয়নি। বৈঠকের বিষয়ে পরে পুতিনকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।

তবে ন্যাটোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য রুশ হামলা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে ক্রেমলিন ‘ভয় ছড়ানোর গল্প’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও র‍্যাটক্লিফের সফরকে ‘আধা-নিয়মিত’ সফর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের জন্য কাজ করছে। ফলে সিআইএ প্রধানের মস্কো সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।

এদিকে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রুশ হামলাও অব্যাহত রয়েছে। স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক রাতেই রাশিয়া ইউক্রেনে ২৫৮টি ড্রোন ছুড়েছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, তারা ২৩৩টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। রাজধানী কিয়েভ, ওদেসাসহ বিভিন্ন এলাকা রুশ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

পাল্টা হিসেবে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সরবরাহ অবকাঠামোতেও হামলা বাড়িয়েছে ইউক্রেন। রাশিয়ার বড় অনলাইন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজের পর দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ওজনের গুদাম ও লজিস্টিক স্থাপনাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনের দাবি, এসব স্থাপনায় থাকা কিছু ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য’ রাশিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। মস্কো অবশ্য এর পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলাকে ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খোলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত থাকলে ইউক্রেনের ‘সবচেয়ে সংবেদনশীল অর্থনৈতিক খাতগুলোতে’ পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

রাশিয়াকে ঘিরে ইউরোপের নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়ছে। সুইডেনের সামরিক বাহিনী দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটির কাছে রুশ নাগরিকের মালিকানাধীন একটি সম্পত্তি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। সামরিক কর্তৃপক্ষের মতে, ড্রোন যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতায় ওই সম্পত্তির অবস্থান জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় এটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া প্রয়োজন।

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং ওয়াশিংটন ন্যাটোর প্রতি তার প্রতিশ্রুতিতে অটল রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রচলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ক্ষেত্রে আরও বড় দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে ইউক্রেনকে পশ্চিমা দূরপাল্লার অস্ত্র ও প্রযুক্তি দেওয়া, রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনীয় হামলা, মস্কোর পাল্টা হুমকি এবং সিআইএ প্রধানের আকস্মিক মস্কো সফর—সবকিছু মিলিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কোনো ন্যাটো সদস্য দেশের সামরিক স্থাপনায় রুশ হামলা কিংবা পশ্চিমা কোনো সামরিক স্থাপনায় রুশ পাল্টা আঘাত হলে ইউক্রেন যুদ্ধ সরাসরি ন্যাটো-রাশিয়া সংঘাতে গড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সূত্রঃ স্কাই নিউজ

এম.কে

আরো পড়ুন

গাজায় মানবিক সংকটের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত

আত্মীয়দের সপ্তাহে ১০০ পাউন্ড দানে শামীমা বেগমের জীবনযাপন, চলমান আইনি লড়াই অব্যাহত

২০২০ সালে ব্রিটেনের এক-চতুর্থাংশ মৃত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল!