বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পাঁচটি জাহাজের নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজের নাম রাখা হয়েছে ‘অদম্য বাংলা’। বাকি চারটি জাহাজের নামকরণ করা হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এমন চার সদস্যের নামে, যারা দেশের স্বার্থে এবং দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের মধ্যে দুজন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিহত হন, একজন বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ হন এবং অন্যজন র্যাবে প্রেষণে কর্মরত অবস্থায় সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ হারান।
নতুন নামকরণ করা জাহাজগুলো হলো—বিসিজিএস নুরুল ইসলাম, বিসিজিএস ফিরোজ কবির, বিসিজিএস এম. হুমায়ুন কবির ও বিসিজিএস আশরাফ সিদ্দিকী। এই নামকরণের মধ্য দিয়ে কর্তব্য পালন করতে গিয়ে আত্মত্যাগ করা চার নৌসেনার স্মৃতিকে সম্মান জানানো হয়েছে।
কঙ্গোতে নিহত নৌসেনা নুরুল ইসলামের নামে জাহাজঃ
বিসিজিএস নুরুল ইসলাম নামটি রাখা হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর লিডিং সিম্যান (সিডি) এম. নুরুল ইসলামের স্মরণে। তিনি ছিলেন নৌবাহিনীর একজন দক্ষ ডুবুরি ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্ট BANBAT-2-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।
২০০৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি টহল দেওয়ার সময় মিলিশিয়াদের অতর্কিত হামলায় নিহত হন নুরুল ইসলাম। দেশের বাইরে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার এই আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পায়। মৃত্যুর পর জাতিসংঘ তাকে দ্যাগ হ্যামারশোল্ড পদকে ভূষিত করে।
বঙ্গোপসাগরে ঝড়ে নিখোঁজ ফিরোজ কবিরঃ
বিসিজিএস ফিরোজ কবির নামকরণ করা হয়েছে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ফিরোজ কবিরের নামে। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা শহীদ ফরিদের অধিনায়ক ছিলেন।
২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গোপসাগরে প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে তার জাহাজ। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জাহাজের সদস্যদের সহায়তা করতে গিয়ে বিশাল ঢেউয়ে ভেসে যান ফিরোজ কবির। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।
তাকে উদ্ধারে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ব্যাপক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার মরদেহও কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া এই নৌ কর্মকর্তার স্মৃতি ধরে রাখতেই তার নামে কোস্ট গার্ডের জাহাজের নামকরণ করা হয়েছে।
আমিনবাজারে নিহত হুমায়ুন কবিরের নামে জাহাজঃ
বিসিজিএস এম. হুমায়ুন কবির নামটি রাখা হয়েছে সিনিয়র চিফ পেটি অফিসার এম. হুমায়ুন কবিরের স্মরণে। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ছিলেন এবং প্রেষণে র্যাব-১১-এ উপসহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
২০০৭ সালের মার্চে সাভারের আমিনবাজারের কাছে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা দায়িত্ব পালন করছিলেন হুমায়ুন কবির। এ সময় র্যাবের আরেক সদস্যসহ তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ হারানো এই নৌসেনার আত্মত্যাগও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
দক্ষিণ সুদানে শান্তিরক্ষা মিশনে নিহত আশরাফ সিদ্দিকীঃ
বিসিজিএস আশরাফ সিদ্দিকী নামটি রাখা হয়েছে ইনস্ট্রাক্টর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম. আশরাফ সিদ্দিকীর নামে। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শিক্ষা শাখার কর্মকর্তা ছিলেন। দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন আনমিসে (UNMISS) মিলিটারি লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
২০১৮ সালের ২৬ জুন দক্ষিণ সুদানের ইয়েই শহরের কাছে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী জাতিসংঘের গাড়িবহরে হামলা চালায়। ওই হামলায় নিহত হন আশরাফ সিদ্দিকী। তার মরদেহ দেশে আনার পর ঢাকা সেনানিবাসের চপার্স ডেনে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন করা হয়। পরে তাকে মরণোত্তর দ্যাগ হ্যামারশোল্ড পদকে ভূষিত করা হয়।
আত্মত্যাগের স্মৃতি বহন করবে কোস্ট গার্ডের জাহাজঃ
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এই চার সদস্যের জীবন ও আত্মত্যাগের ইতিহাস ভিন্ন হলেও তাদের প্রত্যেকেরই মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দায়িত্ব, সাহস এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকার। কেউ আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায়, কেউ সমুদ্রের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সহকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে, আবার কেউ নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলোর নতুন নামকরণের মধ্য দিয়ে তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৌসদস্যদের জন্যও আত্মত্যাগ ও কর্তব্যনিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে।
সূত্রঃ আইটিভি
এমকে

