যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে স্কুল, নার্সারি বা শিশুদের জন্য সংবেদনশীল স্থানের কাছাকাছি আশ্রয়প্রার্থীদের রাখা যাবে না। একই সঙ্গে নতুন নির্মিত এবং ‘বিলাসবহুল’ হিসেবে বিবেচিত বাড়িতেও তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ নতুন নীতিমালা কার্যকর করা হয়েছে। সরকারের দাবি, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন নির্বাচন আরও সুসংগঠিত ও জনসংবেদনশীল করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন নীতিমালার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে এমন সময়ে, যখন ইংল্যান্ডের শ্রপশায়ারের স্টোক হিথ গ্রামের একটি নতুন আবাসন প্রকল্পে ২১টি নতুন নির্মিত বাড়িতে ৮০ জনের বেশি আশ্রয়প্রার্থীকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি বাড়ির আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই লাখ পাউন্ড।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, ছোট গ্রামীণ এলাকায় এতসংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীকে একসঙ্গে রাখা হলে স্থানীয় জনসেবা ও অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও আপত্তি জানিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, নতুন নির্মিত বাড়িতে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখা উচিত নয়। তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুতেই এমন একটি কঠোর প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে স্টোক হিথের মতো নতুন আবাসন প্রকল্প আর আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জন্য বিবেচিত না হয়।
সরকারি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন নির্দেশিকায় আবাসন নির্ধারণের সময় নতুন নির্মিত বাড়ি, বিলাসবহুল সম্পত্তি এবং স্কুল বা নার্সারির মতো সংবেদনশীল স্থানের নিকটবর্তী এলাকাগুলো এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারদেরও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
তবে স্টোক হিথে আশ্রয়প্রার্থীদের স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এদিকে সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেলের সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করছে। এর পরিবর্তে সাবেক সামরিক ব্যারাক, পুরোনো শিক্ষার্থী আবাসন এবং বহুবাসিন্দার আবাসনের মতো বড় আবাসন কেন্দ্রগুলো ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাস পর্যন্ত ২০ হাজার ৮৮৫ জন আশ্রয়প্রার্থী হোটেলে অবস্থান করছিলেন, যা তিন মাস আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম। বর্তমানে আরও ৭২ হাজার ৭৬৮ জন বিভিন্ন সরকারি আবাসন, বহুবাসিন্দার বাসস্থান এবং সাবেক সামরিক ক্যাম্পে অবস্থান করছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেই আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত সব হোটেল বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে আরও ২০টি হোটেল বন্ধ করা হয়েছে। ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেলের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৪০০ থেকে কমে বর্তমানে ১৭০-এ নেমে এসেছে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের শেষে ৪৮ হাজার ৭৫৮ জন আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন প্রাথমিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিল, যা এক বছর আগের তুলনায় ৫৫ শতাংশ কম এবং ২০১৯ সালের পর সর্বনিম্ন।
তবে একই সময়ে এক লাখের বেশি প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী তাদের আবেদন পুনর্বিবেচনার জন্য আপিল প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা সরকারি অর্থায়নে বিনামূল্যে আবাসনের সুবিধা পাচ্ছেন।
স্টোক হিথে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছেন স্থানীয় কনজারভেটিভ সংসদ সদস্য মার্ক প্রিচার্ড। তার ভাষায়, সীমিত জনসেবাসম্পন্ন একটি ছোট গ্রামীণ এলাকায় এতসংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নয়।
অন্যদিকে বিরোধী দলের ছায়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিস ফিলিপও সরকারের পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলেন, নতুন নির্মিত বাড়িতে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার পরিবর্তে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর দিকে সরকারের মনোযোগ দেওয়া উচিত।
নতুন আবাসন নীতিকে কেন্দ্র করে সরকারের কঠোর অভিবাসন অবস্থান, স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

