যুক্তরাজ্যের কিয়ার স্টারমার সরকার টর্চার (নির্যাতন) ভিকটিমদের আইনি সুরক্ষা দুর্বল করার চেষ্টা করছে বলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ইউরোপ কাউন্সিলের ৪৬টি সদস্য দেশের মন্ত্রীরা ইউরোপিয়ান কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস (ECHR)-এর ব্যাখ্যা পরিবর্তন করে প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী ও বিদেশি অপরাধীদের ডিপোর্ট করা সহজ করার লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক ঘোষণায় সম্মত হতে যাচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার আজ মলদোভার রাজধানী চিসিনাউয়ে এই ঘোষণায় স্বাক্ষর করবেন। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (স্ট্রাসবুর্গ) এবং দেশীয় আদালতগুলোকে ECHR-এর আর্টিকেল ৩ (নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ থেকে মুক্তির অধিকার) এবং আর্টিকেল ৮ (পারিবারিক জীবনের অধিকার) ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আরও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা, যাতে ডিপোর্ট প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়।
সরকারের দাবি, গুরুতর অপরাধীরা এই দুটি আর্টিকেলের অপব্যবহার করে ডিপোর্ট ও এক্সট্রাডিশন ঠেকিয়ে রাখছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদও এই অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সরকার আশা করছে, এই ঘোষণার মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হবে।
লেবার সরকারের এই উদ্যোগকে অনেকে “নোংরা রাজনৈতিক চুক্তি” বলে অভিহিত করেছেন। অক্সফোর্ডের অধ্যাপক এরিক বিয়র্গে কেসি বলেন, “চিসিনাউ ম্যানিফেস্টোতে কোনো নীতিগত ভিত্তি নেই। আর্টিকেল ৩-এর নিরঙ্কুশ নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা নিন্দনীয়। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল এবং স্ট্রাসবুর্গ আদালত এটি প্রত্যাখ্যান করবে।”
ফ্রিডম ফ্রম টর্চার সংস্থার পরিচালক ও নির্যাতনের শিকার কলবাসিয়া হাউসু বলেন, “যুক্তরাজ্য ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের জন্য বিখ্যাত। আর্টিকেল ৩-কে ক্ষুণ্ণ করলে শুধু দেশের সুনাম নষ্ট হবে না, বিশ্বের দমনমূলক সরকারগুলোকে বার্তা দেওয়া হবে যে মৌলিক মানবাধিকারও দর কষাকষির বিষয়।”
জাতিসংঘের কমিটি এগেইনস্ট টর্চারও গত সপ্তাহে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে যে, কনভেনশনের পরিবর্তন অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে ‘পরম’ নিষেধাজ্ঞাকে দুর্বল করছে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ভেরোনিকা ফিকফাক ও কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিকায়েল রাস্ক ম্যাডসেনসহ আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এটি মূলত আদালতকে “পিছু হটতে” বলার একটি রাজনৈতিক সংকেত। তারা মনে করেন, এর আইনি কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।
লেবার সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, টর্চার ভিকটিমদের “পরম সুরক্ষা” অটুট থাকবে এবং এই পরিবর্তন তাদের প্রভাবিত করবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা ইউরোপের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কাজ করছি যাতে অবৈধ অভিবাসন রোধ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের শাসন বজায় রাখা যায়। ECHR গত ৭৫ বছর ধরে ইউরোপে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষা করেছে। আজকের বাস্তবতা অনুসারে একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা প্রয়োজন।”
সরকার এছাড়া প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে (থার্ড কান্ট্রি হাব) পাঠানোর পরিকল্পনাও আলোচনা করছে।
এই উদ্যোগ রিফর্ম ইউকে-এর উত্থান এবং অভিবাসন ইস্যুতে রাজনৈতিক চাপের মধ্যে এসেছে। সরকার ইতিমধ্যে নতুন অভিবাসন বিল আনার ঘোষণা দিয়েছে, যাতে আর্টিকেল ৮-এর প্রয়োগ আরও কঠোর করা হবে।
এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে ইউরোপজুড়ে অভিবাসন নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, এতে দুর্বল ও নির্যাতিত মানুষদের সুরক্ষা হুমকির মুখে পড়বে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

