মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান তাদের নতুন প্রজন্মের জেটচালিত ‘হাদিদ-১১০’ কামিকাজে ড্রোন মোতায়েনের দাবি করেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বলছে, ড্রোনটি আগের সংস্করণের তুলনায় আরও দ্রুতগতির, নিচু উচ্চতায় উড়তে সক্ষম এবং রাডারে শনাক্ত করা কঠিন। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ড্রোনটি ইরানের প্রচলিত হাদিদ-১১০-এর উন্নত সংস্করণ। আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে প্রথমবারের মতো এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের অধিকাংশ আক্রমণাত্মক ড্রোন যেখানে প্রপেলারচালিত এবং তুলনামূলক ধীরগতির, সেখানে নতুন হাদিদ-১১০-এ ব্যবহার করা হয়েছে টার্বোজেট ইঞ্জিন। ইরানি সূত্রের দাবি, এটি ঘণ্টায় প্রায় ৩১৬ মাইল বেগে উড়তে পারে, যা দেশটির পরিচিত ড্রোনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতির বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ড্রোনটি প্রথমে সলিড-ফুয়েল বুস্টারের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা হয়। পরে নির্দিষ্ট গতি ও উচ্চতায় পৌঁছানোর পর জেট ইঞ্জিন চালু হয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদ্ধতি দ্রুত মোতায়েনের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়ার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
নতুন হাদিদ-১১০-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর স্টেলথ নকশা। ইরানি বিশেষজ্ঞদের দাবি, ড্রোনটির গায়ে জোড়াহীন মসৃণ কাঠামো, এস-আকৃতির এয়ার ইনটেক এবং রাডার-শোষণকারী বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, যা এটিকে রাডারে শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্রোনটি প্রায় ৩০ কেজি ওজনের ওয়ারহেড বহন করতে পারে। এর হামলার পাল্লা প্রায় ২২০ মাইল এবং এটি প্রায় এক ঘণ্টা আকাশে অবস্থান করতে সক্ষম। ফলে ইরানের উপকূলসংলগ্ন অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান দাবি করছে, ড্রোনটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। যদিও পশ্চিমা বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, দেশটি দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নে চীন ও রাশিয়ার সহায়তা পেয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই অস্ত্র শুধু সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচির নিয়ন্ত্রণ নিয়মিত সেনাবাহিনীর পরিবর্তে আইআরজিসির হাতে থাকায়, নতুন প্রযুক্তি বাহিনীটির প্রভাব আরও বাড়াতে পারে।
একই সময়ে যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। দুই সপ্তাহের টানা পাল্টাপাল্টি হামলার পর উভয় পক্ষের হামলা আপাতত কমে এসেছে। যদিও আনুষ্ঠানিক কোনো যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়নি, তবুও পরিস্থিতিকে অনেকেই এক ধরনের ‘নীরব বিরতি’ হিসেবে দেখছেন।
এদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার অবস্থানে অনড় রয়েছে এবং যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ ও শান্তির সময় নির্ধারণ করতে দেওয়া হবে না এবং প্রয়োজন হলে ইরান দীর্ঘ সময় ধরে আত্মরক্ষা চালিয়ে যাবে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জানিয়েছে, এই বিরতির লক্ষ্য নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করা। একই সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ড্রোন প্রযুক্তি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। হাদিদ-১১০-এর মতো দ্রুতগতির ও স্টেলথ সক্ষম ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা, যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য এবং ইরানের প্রযুক্তিগত দাবির সত্যতা ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহের ওপরই নির্ভর করবে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

