ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি আরএএফ ফেয়ারফোর্ডকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করে সরাসরি হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠান বিএই সিস্টেমস-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চার্লস উডবার্ন সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান সময়টি তাঁর দেখা “সবচেয়ে হুমকিপূর্ণ সময়” এবং বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যয় যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উডবার্ন বলেন, রাশিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ড, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ইউরোপকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তাঁর ভাষায়, ২০১৬ সালে বিএই সিস্টেমসে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি রাশিয়ার সাবমেরিন তৎপরতা ও সাইবার হামলার ঝুঁকি দেখেছেন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপে সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে।
এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন আইআরজিসি ঘোষণা দেয় যে, ইরানের ভূখণ্ডে হামলার জন্য ব্যবহৃত যেকোনো সামরিক ঘাঁটি তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু। ইরানের দাবি, সাম্প্রতিক অভিযানে মার্কিন বি-১ বোমারু বিমান যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি ব্যবহার করেছে। যদিও যুক্তরাজ্য সরকার এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।
আরএএফ ফেয়ারফোর্ড দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। এটি ইউরোপের অল্প কয়েকটি বিমানঘাঁটির একটি, যেখানে মার্কিন বি-১বি ল্যান্সার কৌশলগত বোমারু বিমান মোতায়েন করা সম্ভব। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, এই ঘাঁটি শুধুমাত্র প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে।
আইআরজিসি আরও অভিযোগ করেছে, যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে সহযোগিতা করেছে। তবে লন্ডন এই অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে।
হুঁশিয়ারির জবাবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের সশস্ত্র বাহিনী ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিন যেকোনো ধরনের হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। রয়্যাল নেভি, ব্রিটিশ আর্মি, রয়্যাল এয়ার ফোর্স এবং ন্যাটো মিত্রদের সমন্বয়ে একটি বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে বলেও জানানো হয়।
চার্লস উডবার্নের মতে, আধুনিক যুদ্ধের ধরন আমূল বদলে গেছে। বিশেষ করে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি এবং ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব সক্ষমতায় দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
গত জুনে ব্রিটিশ সরকার প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ১৫ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও উডবার্নের মতে, এই অর্থও দেশের নিরাপত্তা চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে দীর্ঘমেয়াদি ও বড় পরিসরের বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এদিকে প্রতিরক্ষা ব্যয় আরও বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশায় বিএই সিস্টেমসের শেয়ারের দাম ৩.২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে ৭০৮ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যার আওতায় পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উন্নয়নের কাজ চলবে।
নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, উন্নত যুদ্ধবিমান প্রযুক্তিতে এই বিনিয়োগ যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি এটি দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি, ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং ইউরোপের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা নীতি ও সামরিক ব্যয় নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এম.কে

