যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক ও মুসলিম নারী অধিকারকর্মী আমিনাহ আসিলমির ইসলাম গ্রহণের গল্প ধর্মীয় বিশ্বাস, জ্ঞান অনুসন্ধান ও ব্যক্তিগত উপলব্ধির এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। জন্মের সময় তার নাম ছিল জেনিস হাফ। খ্রিষ্টান পরিবারে বেড়ে ওঠা আমিনাহ ১৯৭৭ সালের ২১ মে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, মুসলিম নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সংলাপ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় জন্ম নেওয়া আমিনাহ দক্ষিণাঞ্চলীয় ব্যাপটিস্ট খ্রিষ্টান পরিবেশে বড় হন। তিনি গির্জার বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন। তার জীবনীতে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে কলেজে নিবন্ধনের সময় কম্পিউটারজনিত ভুলের কারণে তিনি একটি থিয়েটার ক্লাসে ভর্তি হন। ওই ক্লাসে কয়েকজন আরব মুসলিম শিক্ষার্থীও ছিলেন। শুরুতে তিনি তাদের খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে বোঝাতে চেয়েছিলেন। এ উদ্দেশ্যে ইসলাম সম্পর্কে যুক্তি-তর্কের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তিনি কোরআন পড়তে শুরু করেন।
ইসলাম সম্পর্কে বিরোধিতার উপাদান খুঁজতে গিয়ে কোরআনের বক্তব্য তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পড়াশোনা ও আলোচনার মধ্য দিয়ে ইসলাম সম্পর্কে তার ধারণা বদলাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৭ সালের ২১ মে তিনি মুসলিম হন এবং পরবর্তী সময়ে আমিনাহ আসিলমি নাম গ্রহণ করেন। তার জীবনের এই পরিবর্তনকে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ ও নিজস্ব উপলব্ধির মাধ্যমে বিশ্বাস পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
ইসলাম গ্রহণের পর আমিনাহ নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্যদের কাছে তুলে ধরতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা, ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা এবং মুসলিম নারীদের সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়ানো ছিল তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি আন্তর্জাতিক মুসলিম নারী ইউনিয়নের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মুসলিম নারীদের অধিকার এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে তিনি কাজ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ঈদকে পরিচিত করে তোলার উদ্যোগেও তার ভূমিকার কথা বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগ ঈদ উপলক্ষে বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এই ডাকটিকিট চালুর পক্ষে প্রচার ও তদবিরে আমিনাহ আসিলমি যুক্ত ছিলেন। উদ্যোগটি যুক্তরাষ্ট্রের বহুধর্মীয় সমাজে ঈদের পরিচিতি বাড়ানোর একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০০৯ সালে জর্ডানভিত্তিক রয়্যাল ইসলামিক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের প্রকাশিত ‘দ্য ৫০০ মোস্ট ইনফ্লুয়েনশিয়াল মুসলিমস’ তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। বিশ্বজুড়ে মুসলিম সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিদের নিয়ে প্রকাশিত এই তালিকায় তার সামাজিক কর্মকাণ্ড ও মুসলিম নারীদের অধিকার নিয়ে কাজের স্বীকৃতি উঠে আসে।
আমিনাহ আসিলমির জীবন থেমে যায় ২০১০ সালের ৫ মার্চ। নিউইয়র্কে একটি বক্তব্যের অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের নিউপোর্টের কাছে সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। তখন তার বয়স ছিল ৬৫ বছর। দুর্ঘটনায় তার ছেলে মোহাম্মদও আহত হন বলে বিভিন্ন শোকবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মৃত্যুর পর বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন আমিনাহ আসিলমিকে সাংবাদিক, বক্তা, সমাজকর্মী ও মুসলিম নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে স্মরণ করে। ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে শুরু করে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করা পর্যন্ত তার জীবনযাত্রা যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় সচেতনতা ও আন্তধর্মীয় সংলাপের আলোচনায় স্থান পেয়েছে।
সূত্রঃ রয়্যাল ইসলামিক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার
এমকে

