21.9 C
London
August 20, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ইস্ট লন্ডন মসজিদ ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগঃ লন্ডনে মুসলিমবিদ্বেষ ছয় বছরে বেড়েছে ছয় গুণ

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও বৈষম্যের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে লন্ডনে মুসলিমবিদ্বেষের অভিযোগ প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে। ২০২৫ সালে এ ধরনের অভিযোগের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯০৯টিতে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই অভিযোগ এসেছে এক হাজার ৩১টি।

২০২৪ সালের আগস্টে সাউথপোর্টে তিন শিশুকে হত্যার ঘটনার পর যুক্তরাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ ও দাঙ্গার সময় লন্ডনেও ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনার পর হামলাকারীর পরিচয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। উগ্র ডানপন্থী কয়েকজন প্রথমদিকে হামলাকারীকে ইসলামপন্থী অভিবাসী হিসেবে দাবি করলেও পরে সেই তথ্য সঠিক ছিল না বলে জানা যায়।

ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতা শুরু হয়। মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অনেককে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। লন্ডনের ব্রেন্টফোর্ড, হ্যারো, নর্থ ফিঞ্চলি ও ওয়ালথামস্টোর মতো এলাকাতেও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সহিংসতা না ঘটলেও বিভিন্ন এলাকায় পাল্টা বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

মুসলিমবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা টেল মামার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে লন্ডনে মুসলিমবিদ্বেষের অভিযোগ ছিল তিন শতাধিক। ২০২৫ সালে তা বেড়ে এক হাজার ৯০৯টিতে পৌঁছায়। অর্থাৎ চার বছরের মধ্যে অভিযোগের সংখ্যা প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বৃদ্ধি কোনো সাময়িক ঘটনা নয়; বরং মুসলিমবিদ্বেষের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্রমবর্ধমান প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

টেল মামার পরিচালক ইমান আত্তা বলেন, প্রতিটি অভিযোগের পেছনে একজন করে মানুষ রয়েছেন, যিনি শুধু নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিজেকে অনিরাপদ মনে করেছেন। তার মতে, ২০২১ সালের তিন শতাধিক অভিযোগ থেকে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এক হাজারের বেশি অভিযোগে পৌঁছে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

জাতীয় পর্যায়েও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অপরাধ বেড়েছে। পুলিশের নথিভুক্ত মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধের সংখ্যা যুক্তরাজ্যজুড়ে প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার এলাকাকে এ ধরনের অপরাধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মসজিদকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কাও নতুন করে সামনে এসেছে। গত মাসে সাটনে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে এক কিশোরকে পুলিশ আটক করে। ওই ঘটনার পর স্থানীয় মুসলিম নেতাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

সাটন সেন্ট্রাল মসজিদের কোষাধ্যক্ষ মঈন উদ্দিন জানিয়েছেন, ওই ঘটনার পর মসজিদে নতুন করে আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক হতে হচ্ছে। তার মতে, কথিত হামলার পরিকল্পনা মুসল্লিদের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অনেকেই ভাবছেন, সাটন এখনও মুসলিমদের জন্য নিরাপদ জায়গা কি না।

মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লন্ডনসহ বিভিন্ন এলাকায় মুসলিমদের মধ্যে দৃশ্যমান আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমাত্রার ঘৃণামূলক অপরাধ চলতে থাকলে তা ভবিষ্যতে আরও গুরুতর সহিংসতায় রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংগঠনটির মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও মিথ্যা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ঘৃণামূলক প্রচারণা থেকে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মুসলিমবিদ্বেষের প্রভাব লন্ডনের রাজনৈতিক অঙ্গনেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের বিরুদ্ধেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামবিদ্বেষী অনলাইন আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে। বৃহত্তর লন্ডন কর্তৃপক্ষের জন্য করা এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছর সাদিক খানকে উল্লেখ করে প্রায় ২৮ হাজার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে একটি ইসলামবিদ্বেষী শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছিল।

২০২৪ সালে একই ধরনের পোস্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২ হাজার। ২০২২ সালের তুলনায় এই সংখ্যা আট গুণেরও বেশি। পরিস্থিতির কারণে সাদিক খান ও তার পরিবারের জন্য বর্তমানে চব্বিশ ঘণ্টা নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।

লন্ডনের মেয়রের কার্যালয় জানিয়েছে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণার কোনো স্থান লন্ডনে নেই। মুসলিম ও মসজিদের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশকে কঠোর ও শূন্য-সহনশীলতার নীতি অনুসরণে মেয়রের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মেয়রের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে কাজ করা স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনকে সহায়তার জন্য এক কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড বরাদ্দ করা হয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে একত্রিত করার কর্মসূচির মাধ্যমে বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক সহাবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।

লন্ডন বিধানসভার সদস্যদের মধ্যেও মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। শ্রমিক দলের মারিনা আহমাদ এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের হিনা বুখারি যৌথভাবে মেয়রের প্রতি মুসলিমবিদ্বেষের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

হিনা বুখারি অভিযোগ করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের মানবিক মর্যাদা নষ্ট করার প্রবণতা বেড়েছে। তার দাবি, ২০২৪ সালের দাঙ্গার পর ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বৃহত্তর লন্ডন কর্তৃপক্ষ, পরিবহন ব্যবস্থা, দমকল বাহিনী ও মহানগর পুলিশের মধ্যে ইসলামবিদ্বেষবিরোধী নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ এখনও যথেষ্টভাবে কার্যকর হয়নি।

মারিনা আহমাদও নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তার দাবি, বর্ণবাদ ও মুসলিমবিদ্বেষের কারণে তিনিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অপমান ও আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তার মতে, রাজনৈতিক স্বার্থে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ব্যবহার করা হলে তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঘৃণাকে আরও স্বাভাবিক করে তুলতে পারে।

তিনি মনে করেন, মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলায় শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। তরুণদের সঙ্গে কাজ করা, ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে সঠিক তথ্য তুলে ধরা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায় সম্পর্কে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোও জরুরি। তার মতে, মানুষের ভয় ও ভুল ধারণা থেকেই অনেক সময় পূর্বধারণা ও ঘৃণার জন্ম নেয়।

অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, কোনো ধরনের বর্ণবাদী বা ধর্মীয় বিদ্বেষ তারা সহ্য করবে না। মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার চার কোটি পাউন্ড বরাদ্দ করছে। পাশাপাশি মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলায় একটি অ-বাধ্যতামূলক সংজ্ঞা গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের বিদ্বেষকে আরও স্পষ্টভাবে শনাক্ত ও মোকাবিলা করতে পারে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, লন্ডনে মুসলিমবিদ্বেষ এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা, মসজিদে হামলার আশঙ্কা এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে অনলাইন আক্রমণ—সব মিলিয়ে বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও নিরাপত্তাগত উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু কোনো ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নিলে হবে না। বিদ্বেষ ছড়ানোর উৎস শনাক্ত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্যের বিস্তার ঠেকানো, মসজিদ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো জরুরি। লন্ডনের মতো বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় শহরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এখন সামাজিক দায়িত্বের পাশাপাশি জননিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সূত্রঃ মাই লন্ডন\টেল মামা

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের সোমারসেটে অভিবাসন অভিযানে আটজন আটক, রিসাইক্লিং ডিপোতে অবৈধ কাজের অভিযোগ

লন্ডনে রাস্তায় ৬৫ ডিগ্রি, খেলার মাঠে ৫৩ ডিগ্রিঃ তীব্র গরমে জনস্বাস্থ্য সতর্কতা জারি

লরি ড্রাইভারদের জন্য অস্থায়ী ভিসা চালু করবে যুক্তরাজ্য

অনলাইন ডেস্ক