লন্ডনকে একটি বিপজ্জনক, আইনশৃঙ্খলাহীন ও অবনতিশীল শহর হিসেবে তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দাবির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। তিনি এ ধরনের সমন্বিত অনলাইন প্রচারণাকে ‘অন্ধকার অপতথ্যের ঝড়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সাদিক খান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লন্ডনকে ‘আইনহীন নৈরাজ্যপূর্ণ শহর’ হিসেবে তুলে ধরার একটি মিথ্যা ধারণা তৈরি করা হচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাস্তব পরিসংখ্যান ও অনলাইনে প্রচারিত দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।
গ্রেটার লন্ডন অথরিটির এক গবেষণায় লন্ডনের অপরাধ, জাতিগত সংহতি, পুলিশিং এবং বিক্ষোভসংক্রান্ত বিভিন্ন মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর অনলাইন দাবির উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণায় লন্ডনকে বিপজ্জনক ও অবনতিশীল শহর হিসেবে উপস্থাপন করা দাবির পরিমাণ ১৫০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত এবং অভিবাসনসংক্রান্ত মিথ্যা দাবির পরিমাণ ৩৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় কৃত্রিমভাবে পরিচালিত অনলাইন কার্যক্রম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি কনটেন্টের বিষয়টিও উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব প্রচারণার সঙ্গে ডানপন্থী গোষ্ঠী এবং বিদেশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের সাম্প্রতিক গবেষণায় লন্ডনের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে জনমত ও বাস্তব তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে লন্ডনে মোট অপরাধ বেড়েছে বলে ৬২ শতাংশ মানুষ ধারণা করলেও বাস্তবে ওই সময়ে মোট অপরাধ সামান্য কমেছে, প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
একই গবেষণায় ৪০ শতাংশ মানুষ মনে করেছেন ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে লন্ডনে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। অথচ মেয়র সাদিক খান যে তথ্য তুলে ধরেছেন, তাতে ২০২৫ সালে লন্ডনের মাথাপিছু হত্যাকাণ্ডের হার রেকর্ড পর্যায়ে নেমে আসে। ২০২৫ সালে লন্ডনে ৯৭টি হত্যাকাণ্ড রেকর্ড করা হয়, যা ২০২৪ সালের ১০৯টির তুলনায় কম এবং ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন সংখ্যা।
কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষণায় আরও দেখা গেছে, লন্ডনের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের ধারণা বাস্তব পরিসংখ্যানের তুলনায় অনেক বেশি নেতিবাচক। পাঁচ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত এক জরিপে লন্ডনের বাসিন্দাদের অপরাধের শিকার হওয়ার হারও প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি বলে অনুমান করা হয়েছিল।
লন্ডনের হত্যাকাণ্ডের হার নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেসসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোর তুলনায় এবং ব্রাসেলস, বার্লিন, প্যারিস ও মিলানের মতো ইউরোপীয় শহরের তুলনায়ও কম বলে সাদিক খান উল্লেখ করেছেন। গত বছর লন্ডনের মাথাপিছু হত্যাকাণ্ডের হার রেকর্ড পর্যায়ে কমে যাওয়ার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধের কিছু শ্রেণিতে সাম্প্রতিক সময়ে হ্রাসও দেখা গেছে। তবে সব ধরনের অপরাধ একই হারে কমেনি।
বিশেষ করে মোবাইল ফোন ছিনতাই, দোকান থেকে চুরি এবং অন্যান্য সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব অপরাধের কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সমালোচনায় তুলে ধরা হয়েছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষণায় লন্ডনের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নিয়েও মানুষের ধারণা ও বাস্তব তথ্যের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের একটি অংশ লন্ডনে মুসলিম জনসংখ্যা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যান বাস্তব সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি বলে অনুমান করেছেন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ লন্ডনে শরিয়াহ আইনের অধীনে ‘নো-গো জোন’ রয়েছে বলেও বিশ্বাস করেন বলে জরিপে উঠে এসেছে।
সাদিক খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব তথ্যের বিষয়ে রাজনৈতিক দল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এবং সাধারণ মানুষের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন গবেষকও বলেছেন, অপরাধ ও অভিবাসন নিয়ে মানুষের ধারণা অনেক ক্ষেত্রে আবেগ, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া তথ্য দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
তবে লন্ডনে অপরাধের কোনো সমস্যা নেই—এমন দাবি গবেষণাগুলোও করেনি। নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ, বিশেষ করে দোকান থেকে চুরি, মোবাইল ফোন ছিনতাই এবং অন্যান্য দৃশ্যমান অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে অপরাধের বাস্তব ঘটনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা দাবিকে পৃথকভাবে দেখার বিষয়টি বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
এদিকে ‘ওয়ার্ল্ডস বেস্ট সিটিজ’ র্যাঙ্কিংয়ে লন্ডন টানা ১১তম বছরের মতো বিশ্বের সেরা শহরের মর্যাদা পেয়েছে। সাদিক খান এই তথ্যকে লন্ডনের আন্তর্জাতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সাদিক খানের বক্তব্যের সময়েই লন্ডনের ব্রোমলিতে একটি সহিংস ঘটনার ঘটনা সামনে আসে। ১০ সেপ্টেম্বর একটি সংঘর্ষে মেশেটি ও জোম্বি নাইফ ব্যবহারের অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের জন্য কোনো বৃহত্তর হুমকি নেই। ঘটনাটি লন্ডনে দৃশ্যমান অপরাধ ও জননিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
লন্ডন নিয়ে জনমত, অপরাধের প্রকৃত পরিসংখ্যান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সাদিক খান এই ব্যবধানকে ‘অন্ধকার অপতথ্যের ঝড়’ হিসেবে বর্ণনা করলেও গবেষণা ও পুলিশের তথ্য একই সঙ্গে দেখাচ্ছে—কিছু অপরাধ কমেছে, আবার নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ নিয়ে বাস্তব উদ্বেগও রয়েছে।
সূত্রঃ জিএলএ এবং কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষণা
এম.কে

