পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানার পার্লামেন্ট সমকামিতা ও LGBT কার্যক্রমের বিরুদ্ধে একটি কঠোর আইন পাস করেছে, যার আওতায় নিজেকে সমকামী বা LGBT সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলেও কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হতে পারে। নতুন আইনে LGBT কার্যক্রমের প্রচার, সমর্থন বা অর্থায়নের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
দেশটির পার্লামেন্টে পাস হওয়া এই বিলটি এখন প্রেসিডেন্ট জন ড্রামানি মাহামার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সংগঠন ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর প্রচারণার পর বিলটি আইন হিসেবে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, কেউ যদি নিজেকে লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার বা কুইয়ার (LGBTQ) হিসেবে পরিচয় দেন, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। একইসঙ্গে সমলিঙ্গের সম্পর্কের জন্য বিদ্যমান তিন বছরের সর্বোচ্চ কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে।
এছাড়া LGBT কর্মকাণ্ডের প্রচার, সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা বা এ ধরনের সংগঠন পরিচালনা এবং অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিলটিতে আরও বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ যৌন কর্মকাণ্ড পরিচালনার উদ্দেশ্যে কোনো পতিতালয় পরিচালনা করলে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
ঘানার আইনপ্রণেতারা বলছেন, এই আইন দেশের পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক কাঠামো এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। তাদের মতে, পশ্চিমা সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে ঘানার সমাজকে রক্ষা করাই এই আইনের মূল উদ্দেশ্য।
তবে মানবাধিকার সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞরা এ আইনকে মৌলিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের আশঙ্কা, আইনটি যৌন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, হয়রানি এবং সহিংসতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
মানবাধিকার আইনজীবী গ্লোরিয়া বোয়াডু বলেছেন, “এই আইন শুধু LGBT ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নয়, বরং মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া যে কাউকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে। এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য উদ্বেগজনক।”
তিনি আরও বলেন, “যখন কোনো রাষ্ট্র মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলাকে অপরাধে পরিণত করে, তখন তা নিজের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে ফেলে।”
বিলে সাংবাদিক, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের জন্য কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে, যাতে তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় আইনের আওতার বাইরে থাকতে পারেন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এসব ব্যতিক্রম বৃহত্তর উদ্বেগ দূর করতে যথেষ্ট নয়।
ঘানার সাংবাদিক ক্যালেব আহিনাকওয়াহ সতর্ক করে বলেছেন, আইনটি সাধারণ মানুষকে LGBT বলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হয়রানি কিংবা আক্রমণে উৎসাহিত করতে পারে। এতে সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমকামিতাবিরোধী আইন কঠোর হওয়ার প্রবণতার মধ্যেই ঘানার এই পদক্ষেপ এসেছে। ২০২৩ সালে উগান্ডা বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর সমকামিতাবিরোধী আইনগুলোর একটি পাস করে, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড এবং সমকামিতার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়।
অন্যদিকে চলতি বছরের শুরুতে সেনেগালও সমলিঙ্গের সম্পর্কের জন্য সর্বোচ্চ কারাদণ্ডের মেয়াদ বাড়িয়ে ১০ বছর করেছে এবং সমকামিতার প্রচারকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘানার নতুন আইন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলবে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঘানার সম্পর্কেও নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
বিলটি প্রেসিডেন্টের অনুমোদন পেলে ঘানা আফ্রিকার সেইসব দেশের কাতারে যুক্ত হবে, যেখানে সমকামিতা এবং LGBT পরিচয়কে আইনগতভাবে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

