26.8 C
London
August 17, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

চড়া বাড়ির দাম, নতুন ভাড়াটিয়া আইন—যুক্তরাজ্যে বাড়িওয়ালাদের জন্য কঠিন সময়

যুক্তরাজ্যের আবাসন বাজারে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া—দুই পক্ষই বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছেন। একদিকে বাড়ির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন ভাড়াটিয়া-সুরক্ষা আইন এবং উচ্চ সম্পত্তিমূল্যের কারণে বিশেষ করে লন্ডন, অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজের মতো শহরে বাড়ি ভাড়া দিয়ে বিনিয়োগের তুলনামূলক লাভ কমে গেছে।

১৭ আগস্ট প্রকাশিত মেট্রোর এক প্রতিবেদনে বাড়ির গড় মূল্য, মাসিক ভাড়া এবং মোট ভাড়া-ফলনের হিসাবের ভিত্তিতে ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যের কোন শহরগুলো বাড়িওয়ালাদের জন্য সবচেয়ে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ক্যামব্রিজ। সেখানে একটি বাড়ির গড় মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার ৭০৯ পাউন্ড, মাসিক গড় ভাড়া ১ হাজার ৬০০ পাউন্ড এবং মোট ভাড়া-ফলন মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অক্সফোর্ড। শহরটিতে গড় মাসিক ভাড়া ১ হাজার ৭৭৮ পাউন্ড হলেও বাড়ির গড় মূল্য প্রায় ৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৫ পাউন্ড। ফলে ভাড়া-ফলন দাঁড়িয়েছে ৫ শতাংশে।

লন্ডনের অবস্থাও বাড়িওয়ালাদের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। রাজধানীতে গড় মাসিক ভাড়া ২ হাজার ১১৯ পাউন্ড হলেও একটি বাড়ির গড় মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৫৪২ পাউন্ড। এর ফলে মোট ভাড়া-ফলন ৫ দশমিক ১ শতাংশ। তবে লন্ডনের কিছু এলাকায় তুলনামূলক বেশি ফলন পাওয়া যাচ্ছে—বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহ্যামে ৬ দশমিক ২২ শতাংশ, নিউহ্যামে ৬ শতাংশ এবং বেক্সলেতে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

কম ফলনের তালিকায় এরপর রয়েছে ইয়র্ক, সাউথেন্ড, ব্রাইটন, রিডিং, ব্রিস্টল, মিল্টন কেইনস এবং ওয়ার্থিং। ইয়র্কে ভাড়া-ফলন ৫ দশমিক ৩ শতাংশ, সাউথেন্ডে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, ব্রাইটন ও রিডিংয়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, ব্রিস্টলে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, মিল্টন কেইনসে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ওয়ার্থিংয়ে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

তবে যুক্তরাজ্যের উত্তরাঞ্চলে চিত্রটি অনেকটাই ভিন্ন। তুলনামূলক কম বাড়ির দাম সেখানে বাড়িওয়ালাদের বেশি ভাড়া-ফলনের সুযোগ দিচ্ছে। আঞ্চলিক হিসাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গড় ভাড়া-ফলন ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, স্কটল্যান্ডে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

শহরগুলোর মধ্যে সান্ডারল্যান্ড বিশেষভাবে এগিয়ে। সেখানে মাসিক গড় ভাড়া মাত্র ৬৫৯ পাউন্ড হলেও বাড়ির গড় মূল্য প্রায় ৮৫ হাজার পাউন্ড। ফলে মোট ভাড়া-ফলন ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অ্যাবারডিনে এই হার ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, বার্নলিতে ৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং ডান্ডি ও মিডলসব্রোতে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। হালে ভাড়া-ফলন ৮ শতাংশ।

এই পার্থক্য দেখাচ্ছে, বেশি ভাড়া মানেই বেশি লাভ নয়। লন্ডনের মতো শহরে ভাড়া অনেক বেশি হলেও বাড়ি কেনার খরচ এতটাই বেশি যে সম্পত্তির মূল্যের তুলনায় ভাড়া থেকে পাওয়া আয় তুলনামূলকভাবে কম। বিপরীতে উত্তরাঞ্চলের শহরগুলোতে বাড়ির দাম কম হওয়ায় অপেক্ষাকৃত কম ভাড়াতেও বিনিয়োগের ওপর বেশি ফলন পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে ইংল্যান্ডে ভাড়াটিয়াদের অধিকারও সম্প্রতি আরও শক্তিশালী হয়েছে। নতুন আইনি ব্যবস্থায় বছরে একবারের বেশি ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ সীমিত করা, ‘নো-ফল্ট’ উচ্ছেদ বন্ধ করা, ভাড়া নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দর হাঁকানো বন্ধ করা এবং সরকারি সহায়তা গ্রহণকারী ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে বৈষম্য ঠেকানোর মতো পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে বাড়িওয়ালাদের জন্য ভাড়া ব্যবসার নিয়মকানুন আরও কঠোর হয়েছে।

তবে সংকট শুধু বাড়িওয়ালাদের নয়। বাড়ির মূল্য দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ নিজস্ব বাড়ি কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যাদের পারিবারিক সম্পদ বা আর্থিক সহায়তা নেই, তাদের দীর্ঘ সময় ভাড়া বাসায় থাকার ঝুঁকি বাড়ছে।

লন্ডনে পরিস্থিতি আরও কঠিন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শহরটির মোট আবাসনের ৩০ দশমিক ১ শতাংশ এখন ব্যক্তিমালিকানাধীন ভাড়া দেওয়া বাড়ি—১৯৭১ সালের পর সর্বোচ্চ হার। অথচ যাদের জন্য ব্যক্তিগত ভাড়া বহন করা কঠিন, তাদের জন্য কাউন্সিলের আবাসনও পর্যাপ্ত নয়।

সামাজিক আবাসন নির্মাণের হার কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। শেল্টারের গবেষণা অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বছরে ২ লাখের বেশি সামাজিক ভাড়ার বাড়ি নির্মিত হলেও ২০২৩-২৪ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ১০ হাজারে।

এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের ‘রাইট টু বায়’ নীতির প্রভাবও রয়েছে। ১৯৮০ সালে চালু হওয়া এই ব্যবস্থায় কাউন্সিলের ভাড়াটিয়ারা ছাড়ে নিজেদের বাড়ি কেনার সুযোগ পান। এতে বহু পরিবার বাড়ির মালিক হতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে কাউন্সিলের আবাসনের মজুত কমেছে এবং বিক্রি হওয়া কিছু বাড়ি পরবর্তীতে বেসরকারি ভাড়ার বাজারে ফিরে এসেছে।

নিউ ইকোনমিকস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ‘রাইট টু বায়’-এর মাধ্যমে বিক্রি হওয়া কাউন্সিলের বাড়িগুলোর ১০টির মধ্যে চারটিরও বেশি বর্তমানে বেসরকারি বাড়িওয়ালাদের মালিকানায় রয়েছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের আবাসন বাজারে একটি জটিল দ্বৈত সংকট তৈরি হয়েছে। বাড়ির দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষের জন্য মালিকানা কঠিন হয়ে পড়ছে, আবার একই উচ্চ সম্পত্তিমূল্য ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড ও লন্ডনের মতো শহরে বাড়িওয়ালাদের বিনিয়োগের ভাড়া-ফলনও কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে নতুন ভাড়াটিয়া-সুরক্ষা আইন বাড়িওয়ালাদের ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ তৈরি করেছে। ফলে দেশটির আবাসন বাজারে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া—দুই পক্ষের সমস্যাই ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সূত্রঃ মেট্রো

এম.কে

আরো পড়ুন

হোম অফিসের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসাইলাম কেইসে ঘুষ দাবির অভিযোগ

ক্রেতারা এক পোশাক বেশিদিন পরায় নতুন সার্ভিস এমঅ্যান্ডএসের

সহসাই খুলছে না ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

নিউজ ডেস্ক