ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার-এর পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে ব্রিটেন তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত জোটকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, যার প্রভাব পড়তে পারে ন্যাটোর ভবিষ্যতের ওপরও।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মিত্রদের পর্যাপ্ত সমর্থন না পেলে তিনি ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের অবস্থান ওয়াশিংটনের অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
ব্রিটেন শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। এমনকি প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেয়, যা পরে আংশিকভাবে পরিবর্তন করা হয়। তবে এই বিলম্বিত সিদ্ধান্তকে কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য হওয়ায় এই জোটের নিরাপত্তা কাঠামো অনেকাংশেই ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সরে যাওয়া ন্যাটোর জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হতে পারে।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ সামরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দেশটির নৌবাহিনীর প্রধান স্যার গুইন জেনকিন্স স্বীকার করেছেন, বাহিনী এখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়। সমালোচকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় এই দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময়কার প্রস্তুতির তুলনা টানা হচ্ছে। সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার দ্রুত নৌবহর মোতায়েন করতে সক্ষম হন। কিন্তু এখন একই ধরনের সংকটে ব্রিটেনের প্রতিক্রিয়া অনেকটাই সীমিত বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
স্টারমার অবশ্য তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তার এই অবস্থান ১৯৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ইস্যুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন-এর নীতির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ন্যাটোকে “একপাক্ষিক সম্পর্ক” বলে মন্তব্য করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ইঙ্গিত বহন করে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রতিরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হলে তা ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান ইস্যুকে ঘিরে উদ্ভূত এই সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং এটি পশ্চিমা জোটের ঐক্য এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

