থাইল্যান্ডের পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো থেকে নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যৌন ব্যবসায় বাধ্য করছে মানব পাচারকারী চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসী জীবনের প্রতিশ্রুতি, বিপুল অর্থ আয়ের প্রলোভন এবং ঋণের ফাঁদে ফেলে নারীদের নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠেছে। যুক্তরাজ্যে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের প্রধান হিসেবে পরিচিত ‘ব্রথেল কুইন’ নামে পরিচিত আচরিয়া স্পার ও তার স্বামী চিন পিংয়ের কারাদণ্ডের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৯ বছর বয়সী আচরিয়া স্পার এবং তার ৫৬ বছর বয়সী স্বামীকে থাইল্যান্ড থেকে যুক্তরাজ্যে নারী পাচারের দায়ে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে তারা থাইল্যান্ড থেকে ২২ জন নারীকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে এসেছিলেন। এ ছাড়া আরও দুজন নারীকে ডেনমার্ক ও স্কটল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাচারের শিকার নারীদের প্রত্যেককে কয়েক হাজার থেকে দশ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ঋণের বোঝা বহন করতে হয়েছে। কেউ কেউ প্রতিদিন প্রায় ১৪ ঘণ্টা কাজ করেও প্রতি শিফটে মাত্র ৫০ পাউন্ড পর্যন্ত পারিশ্রমিক পেতেন। পাচারকারীরা এই ঋণকে নারীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত বলে অভিযোগ রয়েছে।
মানব পাচারবিরোধী সংস্থা মেকং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাট ফ্রিডম্যান বলেন, থাইল্যান্ডের পাতায়ার মতো পর্যটন শহরগুলোতে নিয়োগকারীরা সম্ভাব্য শিকার খুঁজে বের করে। তারা নারীদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিদেশে কাজের প্রস্তাব দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চেয়েও সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের প্রলুব্ধ করা কার্যকর হয়।
দ্য সানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচারকারীরা টিকটকে আকর্ষণীয় ভিডিও প্রকাশ করে নারীদের যুক্তরাজ্যে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করত। সেখানে ভালো আয় ও উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। কিন্তু যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর অনেক নারীকে বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে তাদের কয়েক মাস পর্যন্ত পতিতালয় থেকে বের হতে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানব পাচারবিরোধী বিশেষজ্ঞদের মতে, পাচারকারীদের অন্যতম প্রধান কৌশল হলো ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। ফ্রিডম্যানের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ এক লাখ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ঋণ পরিশোধের হিসাব স্বচ্ছভাবে রাখা হয় না। ফলে নারীরা কাজ করেও বুঝতে পারেন না কত টাকা পরিশোধ হয়েছে, আর ঋণ শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও ক্রমেই কমে যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, আচরিয়া স্পার নারীদের ভয় দেখাতে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার হুমকিও দিতেন। অন্যদিকে, মানব পাচারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু ওয়ালিস বলেন, পাচারকারীরা অনেক সময় নারীদের যৌন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও তাদের পরিবারের কাছে পাঠানোর ভয় দেখায়।
গত বছর যৌন শোষণমূলক ‘ক্লাউড নাইন’ চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে জি ঝাং নামের ৪৫ বছর বয়সী এক নারীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি নারীদের ইরোটিক ম্যাসাজকেন্দ্রে কাজ করতে বাধ্য করতেন এবং তাদের আয়ের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে নিতেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভূমিকম্প, সুনামি কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর অসহায় নারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে মানব পাচারকারীরা। এসব দুর্যোগে ঘরবাড়ি, কর্মসংস্থান ও পরিবারের নিরাপত্তা হারানো মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা পশ্চিমা দেশে চাকরি ও ভালো জীবনের প্রতিশ্রুতি দেয়।
অ্যান্ড্রু ওয়ালিসের মতে, দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা কোনো নারী যখন বিদেশে কাজের সুযোগ পান, তখন সেই প্রস্তাব তার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাকে।
সব নারী যে প্রতারণার শিকার হয়ে যুক্তরাজ্যে আসেন, তা নয়। কেউ কেউ যৌনকর্মের উদ্দেশ্যে আসার বিষয়টি জানলেও পরে তাদের প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বেশি কঠোর পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। পারিশ্রমিক না দেওয়া, চলাফেরায় বাধা দেওয়া এবং হুমকি দিয়ে আটকে রাখার মতো ঘটনাও ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড আধুনিক দাসত্ব ও মানব পাচারের অপরাধের মধ্যে পড়ে।
যুক্তরাজ্যে আধুনিক দাসত্ব প্রতিরোধে ২০১৫ সালের আধুনিক দাসত্ব আইন আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে আইনটি প্রণয়নের এক দশক পরও এ ধরনের অপরাধ বন্ধ হয়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজমে সম্ভাব্য আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে ২৩ হাজার ৪১১ জনকে পাঠানো হয়েছিল। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ২২ শতাংশ বেশি, যা রেকর্ড সর্বোচ্চ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যৌন শোষণের অভিযোগের অনুপাত মোটামুটি একই রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অ্যান্ড্রু ওয়ালিসের অভিযোগ, এক দশক আগের তুলনায় বর্তমানে আধুনিক দাসত্ব প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের মনোযোগ কমেছে। আগে আধুনিক দাসত্ব ও সংঘবদ্ধ অভিবাসন অপরাধ নিয়ে পৃথক কর্মসূচি থাকলেও এখন সেটি সংঘবদ্ধ অভিবাসন অপরাধকেন্দ্রিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমিত হয়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
ওয়ালিসের হিসাব অনুযায়ী, আধুনিক দাসত্বের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৬০ বিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হয়, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশ। তার মতে, মানব পাচার ও যৌন শোষণ বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা নারীদের সুরক্ষা এবং পাচারকারীদের নিয়োগপদ্ধতি ভেঙে দেওয়ার ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সূত্রঃ দ্য সান
এমকে

