বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা ওয়ালিদ ইসলাম বর্তমানে ইরানের তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শৈশব থেকে লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে সামাজিক বৈষম্য, অপমান ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। দীর্ঘ ৩৪ বছর নিজের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক গোপন রাখার পর ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি ফেসবুকে প্রকাশ্যে নিজের পরিচয় তুলে ধরেন।
তেহরানের জর্ডান এলাকায় ওয়ালিদের ছোট্ট বাসায় ঢুকলে চোখে পড়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন। দেয়ালে হাতে আঁকা জলরঙের ছবি, কোণায় শিকা, তাকজুড়ে নকশিকাঁথার টুকরো। পাশাপাশি রয়েছে মালয়েশিয়ার কাঠের পুতুল, জাপানের সিরামিকসহ বিভিন্ন দেশের শিল্পসামগ্রী। কূটনৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি এসব সংগ্রহের মাধ্যমে বিদেশি অতিথিদের কাছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি তুলে ধরেন তিনি।
গোপালগঞ্জের একটি বস্তিতে আট ভাইবোনের পরিবারে জন্ম ওয়ালিদের। তার বাবা ট্রাক চালিয়ে সংসার চালাতেন। আর্থিক অনটনের মধ্যেও সন্তানদের মানুষ করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন মা আমিনা বেগম।
ওয়ালিদের বর্ণনা অনুযায়ী, চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই এলাকার কিছু মানুষ তার আচরণ ও চলাফেরার কারণে তাকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করেন। স্থানীয় হিজড়া সম্প্রদায়ের কয়েকজন তাকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইতেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। প্রতিবারই বাবা-মা তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করতেন। একাধিকবার মা নিজের সোনার চুড়ি খুলে দিয়ে ছেলেকে তাদের কাছ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন বলে জানিয়েছেন ওয়ালিদ।
ছেলের নিরাপত্তা ও পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে একপর্যায়ে পরিবার গোপালগঞ্জ ছেড়ে যশোরে চলে যায়। সেখানে তাকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানো হয়। রাস্তায় হয়রানি এড়াতে স্কুলবাসে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি ইংরেজি, বিতর্ক, গান ও ছবি আঁকায় দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। তবে নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ও সামাজিক চাপ তার জীবনের শুরু থেকেই ছিল।
উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হন ওয়ালিদ। স্নাতক শেষে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথমবার নন-ক্যাডার হলেও ৩৫তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন। তার এই সাফল্যে পরিবারের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ সরকার ২০১৪ সালে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিলেও ওয়ালিদের শিক্ষাগত সনদে লিঙ্গ পরিচয় পুরুষ হিসেবেই উল্লেখ ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেওয়ার পর চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে তার কর্মস্থল হয় ইরানের তেহরান।
২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি রাতে তেহরানে বসে ফেসবুকে নিজের পরিচয় প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন ওয়ালিদ। পোস্টে নিজেকে বাংলাদেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের ক্যাডার কর্মকর্তা এবং বিশ্বের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের কূটনীতিক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। দীর্ঘদিন নিজের পরিচয় গোপন রাখার মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান।
পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকে তাকে অভিনন্দন ও সমর্থন জানান, আবার কেউ কেউ নেতিবাচক মন্তব্য করেন। প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে ওয়ালিদ বলেন, পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের সংকট এবং মানুষের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে তিনি প্রকাশ্যে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তার কথা বলার ধরন ও হাঁটাচলা নিয়েও মানুষ প্রায়ই প্রশ্ন তুলত বলে জানান তিনি।
নিজের ফেসবুক পোস্টে কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানি ও অপমানের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন ওয়ালিদ। তার অভিযোগ, প্রশিক্ষণ চলাকালে এক প্রশিক্ষক সহকর্মীদের কাছে তার বিরুদ্ধে যৌন প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। এর প্রতিবাদ করায় তার হাঁটাচলা ও কথা বলার ধরন নিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট ধরে আলোচনা করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনেও কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। ওয়ালিদের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় একজনের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের কথাও এগিয়েছিল। সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় তিনি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নারী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনটি বড় অস্ত্রোপচারের পর ৩৬ দিন বিছানায় কাটাতে হয় তাকে। কিন্তু পরে ওই ব্যক্তি তাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান এবং অন্য কাউকে বিয়ে করেন। ফলে তার অস্ত্রোপচার-পরবর্তী প্রক্রিয়াও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এসব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি সমাজের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওয়ালিদ। তার বক্তব্য, লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে কাউকে অসম্মান বা অবমাননা করার সুযোগ নেই। অন্য সবার মতো তাদেরও সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
নিজের জীবনের সংগ্রামে মায়ের অবদানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন ওয়ালিদ। শৈশবে তাকে রক্ষা করা থেকে শুরু করে পড়াশোনা ও কর্মজীবনে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিটি পর্যায়ে পরিবারের সমর্থন পেয়েছেন তিনি। মাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা উল্লেখ করে ওয়ালিদ বলেছেন, তার ঘরে জন্ম না হলে হয়তো তাকেও হিজড়া ডেরায় বড় হতে হতো এবং জীবিকার জন্য রাস্তাঘাট ও বাসে টাকা সংগ্রহ করতে হতো।
পরিচয় প্রকাশের পর নিজেকে আগের চেয়ে স্বস্তিতে অনুভব করছেন বলে জানিয়েছিলেন ওয়ালিদ। বর্তমানে তেহরানে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ছবি আঁকা এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী সংগ্রহ করছেন তিনি। তার জীবনকাহিনিতে উঠে এসেছে সামাজিক বৈষম্যের মুখে ব্যক্তিগত সংগ্রাম, পরিবারের সমর্থন এবং প্রতিকূলতা অতিক্রম করে পেশাগত অবস্থান তৈরির অভিজ্ঞতা।
সূত্রঃ প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, নিউ এজ, বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, শেয়ার-নেট বাংলাদেশ এবং ওয়ালিদ ইসলামের ফেসবুক পোস্ট
এমকে

