দেশে তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা চলাকালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের বক্তব্য ও সংকট মোকাবিলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদাহরণ হিসেবে সামনে এনে বলেছেন, জনদুর্ভোগের বিষয়টি সামনে এলে প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি স্বীকার করে বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের বক্তব্যে সব সময় সেই ধরনের স্বীকারোক্তি বা দায়বদ্ধতার প্রতিফলন দেখা যায় না।
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি-বিধির ৬৮ বিধিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনার শেষে ডেপুটি স্পিকার এ মন্তব্য করেন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের দেওয়া নোটিশের ভিত্তিতে হওয়া ওই আলোচনায় তীব্র গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যাওয়া এবং এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে সৃষ্ট প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
আলোচনায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এরপর পরিস্থিতি জনগণের সামনে আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানাতে গিয়ে ডেপুটি স্পিকার প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টি সামনে আনেন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে জনসমক্ষে প্রশ্ন উঠলে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি স্বীকার করেন এবং বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায় না। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী যখন বিষয়টি ‘অ্যাকনলেজ’ করে দুঃখ প্রকাশ করেন, তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছ থেকে এমন ব্যাখ্যা শোনা যায়—‘তার লম্বা, এই কারণে বিদ্যুৎ চলে যায়।’
ডেপুটি স্পিকারের এই বক্তব্য কার্যত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মতো জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য কতটা স্পষ্ট, গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত—সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি সংশ্লিষ্টদের জাতির সামনে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ঘিরেও রাজনৈতিক ও পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিডিনিউজ২৪-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ সেলিমের ছোট ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নাঈমের সঙ্গে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মেয়ে সারাহ হাসিন মাহমুদের বিয়ে হয়েছে। সেই সূত্রে টুকু শেখ সেলিমের বেয়াই।
উল্লেখ্য যে, শেখ সেলিমের পরিবারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। শেখ সেলিমের বোনের ছেলে আন্দালিভ রহমান পার্থ বর্তমানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদের সাম্প্রতিক আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট শুধু উৎপাদন বা সরবরাহের সমস্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জনসমক্ষে সংকট ব্যাখ্যা করার ধরন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির প্রশ্নও। প্রধানমন্ত্রী যেখানে সংকটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিষয়টি স্বীকার করছেন বলে ডেপুটি স্পিকার প্রশংসা করেছেন, সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে সেই একই মাত্রার দায় স্বীকার ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকার বিষয়টি সংসদেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সংকট মোকাবিলায় তাই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা নয়; জনগণের সামনে সংকটের প্রকৃত কারণ, সরকারের পরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিও স্পষ্ট করা। সংসদে ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্য সেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
এম.কে

