বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)। বিশ্বজুড়ে ৪৭১টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের মূল কাঠামোতে বাধ্যতামূলক পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থাগুলোর ওপর বাড়তি নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক চাপ তৈরি হয়েছে।
এফএএর নির্দেশনার মূল লক্ষ্য উড়োজাহাজের জরুরি বহির্গমন দরজার আশপাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত অংশ ‘বিয়ার স্ট্র্যাপ’ পরীক্ষা করা। পুরোনো বোয়িং ৭৩৭ নেক্সট জেনারেশন (এনজি) মডেলের কয়েকটি উড়োজাহাজে এই অংশে ফাটল শনাক্ত হওয়ার পর একই ধরনের নকশাগত বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজেও দীর্ঘমেয়াদে অনুরূপ কাঠামোগত সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে এফএএ।
তবে এখন পর্যন্ত বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স বহরে এ ধরনের কোনো ফাটল শনাক্ত হয়নি। তারপরও সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে বাধ্যতামূলক পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে এই পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। দেশের অন্যতম প্রধান বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বর্তমানে দুটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্সের মতো আধুনিক উড়োজাহাজ যুক্ত করে বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বহর আধুনিকায়নের বিষয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছিল বলে সংশ্লিষ্ট শিল্প সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
এফএএর নতুন নির্দেশনার পর নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজের নিরাপত্তা যাচাই, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হতে পারে বাংলাদেশি এয়ারলাইনগুলোকে।
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য অতিরিক্ত নির্দেশনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য নির্দেশনায় উড়োজাহাজ পরিদর্শনের সময়সীমা, কাঠামোগত ত্রুটি শনাক্ত হলে রিপোর্টিং এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা তথ্য দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানানোর বিষয় থাকতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ভারতের বিমান পরিবহন খাতে। আকাসা এয়ার, স্পাইসজেট এবং এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসসহ দেশটির বিভিন্ন বিমান সংস্থা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে আরও অনেক ম্যাক্স উড়োজাহাজের অর্ডারও রয়েছে। ফলে এফএএর নতুন নির্দেশনা ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বোয়িংয়ের উড়োজাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক নজরদারি চলছে। ২০১৮ সালে লায়ন এয়ার এবং ২০১৯ সালে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মোট ৩৪৬ জন নিহত হওয়ার পর বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্সের নিরাপত্তা ও নকশা নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ তৈরি হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আলাস্কা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজে দরজার প্যানেল খুলে যাওয়ার ঘটনাও বোয়িংয়ের উৎপাদন ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
নতুন পরিদর্শন নির্দেশনার পাশাপাশি বোয়িংকে প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত পরিবর্তন ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত পরিবর্তনগুলোর সার্টিফিকেশন সম্পন্ন হতে ১২ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
বিমান চলাচল খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের ফলে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় ও সময়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে যাত্রীদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন আকাশপথ যোগাযোগের ওপর। বিশেষ করে দেশের তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী বিভিন্ন খাত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল। ফলে উড়োজাহাজের নিরাপত্তা পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি উড্ডয়ন বিঘ্নিত হলে তা যাত্রী পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রপ্তানি কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ অবস্থায় বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স নিয়ে এফএএর নতুন নির্দেশনা শুধু একটি উড়োজাহাজের কাঠামোগত পরিদর্শনের বিষয় নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার বিমান চলাচল খাতে নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বহর আধুনিকায়ন এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাপনায় নতুন করে সতর্কতার বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্রঃ দ্য ড্যাজলিং ডন
এম.কে

