20.5 C
London
September 15, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার বাড়াতে সাদিক খানের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা

লন্ডনের প্রায় ১২ লাখ বধির ও প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, বৈষম্য কমানো এবং বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক সেবায় তাদের প্রবেশাধিকার বাড়াতে প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে লন্ডন মেয়রের কার্যালয়। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই পরিকল্পনায় পরিবহন, নিরাপত্তা, আবাসন, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একাধিক বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনায় স্থানীয় কাউন্সিল ও আবাসন নির্মাতাদের পর্যাপ্তসংখ্যক প্রতিবন্ধীবান্ধব আবাসন নিশ্চিত করতে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী লন্ডনবাসীরা যাতে তাদের প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা সহজে দাবি করতে পারেন, অপরাধের ঘটনা জানাতে পারেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে ভবন থেকে বের হতে পারেন, সেসব ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা উন্নত করার কথা রয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গবেষণা অনুযায়ী, যেসব পরিবারে অন্তত একজন প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছেন, সেসব পরিবারের দারিদ্র্যের হার গড়ে ৩১ শতাংশ। প্রতিবন্ধী সদস্য নেই—এমন পরিবারের তুলনায় এই হার প্রায় সাত শতাংশ পয়েন্ট বেশি। ২০২৪ সালে লন্ডনের প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে ৫৯ শতাংশ কর্মরত ছিলেন। বিপরীতে প্রতিবন্ধী নন এমন মানুষের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৮০ শতাংশ।

আবাসনের ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান রয়েছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রতিবন্ধী লন্ডনবাসী সামাজিক আবাসনে বসবাস করেন। প্রতিবন্ধী নন এমন বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১০ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রবেশগম্য সামাজিক আবাসন না পাওয়ায় অনেক প্রতিবন্ধী মানুষকে বেসরকারি ভাড়া বাসায় থাকতে হয়, যার ফলে তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়।

প্রতিবন্ধী মানুষের প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সহজ করতেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনের জন্য মতামত দেওয়া কয়েকজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জানিয়েছেন, যোগাযোগের বিভিন্ন বাধা এবং সহজে প্রবেশ করা যায় না—এমন স্থান তাদের প্রাপ্য সহায়তা পাওয়ার পথে বাধা তৈরি করেছে। এ কারণে গ্রেটার লন্ডন অথরিটি (জিএলএ) ‘অ্যাক্সেসিবল অ্যাডভাইস প্রভিশন’ বা প্রতিবন্ধীবান্ধব পরামর্শসেবা উন্নত করার একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ চালু করবে।

এর মাধ্যমে প্রতিবন্ধী লন্ডনবাসীরা তাদের প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা সম্পর্কে আরও সহজে তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল)-এর বিভিন্ন পরিবহন সেবায় প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বিদ্যমান ছাড় ও সুবিধাগুলো সম্পর্কেও তাদের আরও সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরিবহন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে লন্ডনের ‘ফ্লোটিং বাস স্টপ’ নিয়ে চলমান উদ্বেগের বিষয়টি পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়নি। এই ধরনের বাসস্টপে বাসযাত্রীদের ওঠানামার জায়গার সঙ্গে সাইকেল চলাচলের পথের সম্পর্ক থাকায় প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রচারকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।

জুলাই মাসে লন্ডন অ্যাসেম্বলিকে জিএলএ-এর কমিউনিটি ও সামাজিক নীতিবিষয়ক সহকারী পরিচালক টম রাহিলি জানিয়েছিলেন, কর্মপরিকল্পনা তৈরির সময় বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। প্রচারকারীরা ভবিষ্যতে লন্ডনে নতুন ফ্লোটিং বাস স্টপ তৈরির পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন।

প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঘৃণাজনিত অপরাধও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে লন্ডনে প্রতিবন্ধী মানুষকে লক্ষ্য করে ২ হাজার ২৪৫টি প্রতিবন্ধীবিরোধী ঘৃণাজনিত অপরাধের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

এ ধরনের অপরাধ সহজে রিপোর্ট করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা যাতে যথাযথ সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে মেট্রোপলিটন পুলিশ মেয়র’স অফিস ফর পুলিশিং অ্যান্ড ক্রাইম (মোপ্যাক)-এর প্রতিবন্ধী সহ-উৎপাদন বা কো-প্রোডাকশন গ্রুপের সঙ্গে কাজ করবে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী মানুষদের নিরাপদে ভবন থেকে বের করে আনার জন্য লন্ডন ফায়ার ব্রিগেড-এর সঙ্গে কাজ করে নিরাপদ বের হওয়ার পথ তৈরির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

সিটি হল জানিয়েছে, ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণে প্রতিবন্ধী মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এজন্য একজন ‘লিভড এক্সপেরিয়েন্স কো-চেয়ার’ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি কমিউনিটি ও সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক ডেপুটি মেয়রের সঙ্গে কাজ করবেন।

জিএলএ আরও জানিয়েছে, কর্মপরিকল্পনার প্রতিটি পদক্ষেপের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বিষয়ক ফোরামে প্রতি তিন মাসে অগ্রগতির তথ্য দেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য অনলাইনেও প্রকাশ করা হবে।

প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে কাজ করা ইনক্লুশন লন্ডন-এর প্রধান নির্বাহী ট্রেসি ল্যাজার্ড কর্মপরিকল্পনাটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জিএলএ-এর সঙ্গে পরিকল্পনাটি তৈরির প্রক্রিয়ায় কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে তাদের সংগঠন এবং তারা এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

তবে তিনি জানান, প্রতিবন্ধী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দেওয়া সব প্রস্তাব প্রথম কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এখন মূল গুরুত্ব দিতে হবে পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের ওপর এবং এতে নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো যেন আগামী বছরগুলোতে লন্ডনের নীতিনির্ধারণে ব্যবহৃত হয় তা নিশ্চিত করার ওপর।

কর্মপরিকল্পনার ভূমিকায় লন্ডনের মেয়র বলেন, রাজধানীতে প্রায় ১২ লাখ বধির ও প্রতিবন্ধী মানুষ বসবাস করেন এবং তারা লন্ডনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তবে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ এখনো এমন বৈষম্য ও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে এবং লন্ডনের জীবন ও সুযোগ-সুবিধায় পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।

মেয়র বলেন, এসব বাধা দূর করা এবং বধির ও প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমান উন্নত করার লক্ষ্যেই কর্মপরিকল্পনাটি চালু করা হয়েছে। তিনি পরিকল্পনাটিকে শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা হিসেবে নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে লন্ডন অ্যাসেম্বলিতে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের নেতা হিনা বুখারি পরিকল্পনাটির উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিনিয়োগ নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, প্রতিবন্ধী লন্ডনবাসীদের মুখোমুখি হওয়া কাঠামোগত বাধা দূর করতে আরও বড় পরিসরের পরিবর্তন ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

পরিকল্পনাটি প্রথমে মার্চে প্রকাশের কথা থাকলেও পরে জুন এবং শেষ পর্যন্ত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়। পরিকল্পনা প্রকাশের অনুষ্ঠানে মেয়র নিজে উপস্থিত ছিলেন না। তার পরিবর্তে কমিউনিটি ও সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক ডেপুটি মেয়র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

নতুন কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে লন্ডনে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য পরিবহন, আবাসন, কর্মসংস্থান, আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার উন্নত করার জন্য একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

সূত্রঃ মাই লন্ডন

এম.কে

আরো পড়ুন

কনজারভেটিভ পার্টির নেতার লিফলেটে নাইজেল ফারেজের ছবি নিয়ে আলোচনা

গোপনে বিয়ে সারলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

কার্ডিফে এক দিনে ৩০টি গ্রেগস দোকানে খেয়েছেন এক ব্যক্তি!