যুক্তরাজ্যে বিপুল পরিমাণ অপরাধলব্ধ অর্থকে স্বর্ণে রূপান্তর করে বিদেশে পাচারের অভিযোগে আলোচিত এক অর্থপাচার চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্তের পর আইনি পদক্ষেপ সামনে এসেছে। এই ঘটনায় লন্ডনের ৫১ বছর বয়সী বাকা হায়দারের নামও উঠে এসেছে। প্রকাশ্য আদালত-সংক্রান্ত রেকর্ডে বাকা হায়দার, নাথান রিভার্স ও জশ অডসলির নামে Leeds Combined Court Centre-এ T20200519 নম্বরের একটি মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।
এই চক্রের মাধ্যমে প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড মূল্যের অপরাধলব্ধ অর্থকে বৈধ অর্থের মতো দেখানোর জন্য স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতুর ব্যবসাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের মতে, এটি যুক্তরাজ্যে তদন্ত হওয়া সবচেয়ে বড় ধরনের অর্থপাচার কর্মকাণ্ডগুলোর একটি।
ঘটনার কেন্দ্রে ছিল ব্র্যাডফোর্ডভিত্তিক একটি স্ক্র্যাপ জুয়েলারির ব্যবসা। অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কুরিয়ারদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ সেখানে পৌঁছে দেওয়া হতো। পরে সেই নগদ অর্থের উৎস আড়াল করে মূল্যবান ধাতু কেনার কাজে ব্যবহার করা হতো।
অর্থপাচারের এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নগদ অর্থকে এমন সম্পদে রূপান্তর করা, যার মালিকানা ও উৎস শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। তদন্তকারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, অপরাধলব্ধ নগদ অর্থের বিনিময়ে উচ্চমাত্রার বিশুদ্ধতার স্বর্ণের দানা বা ‘গোল্ড গ্রেইন’ কেনা হতো।
এরপর ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে স্বর্ণ কেনার অর্থপ্রবাহ সম্পন্ন করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে স্বর্ণ বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, স্বর্ণ দুবাইয়ে পাঠানোর সময় জাল বাণিজ্যিক চালান বা ভুয়া ইনভয়েস ব্যবহার করা হয়েছিল।
২০১৬ সালে চালানো অভিযান এই গোপন নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় তৈরি করে। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্তের পর চক্রটির বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হয়। অর্থের উৎস, নগদ পরিবহন, স্বর্ণ কেনা, ব্যাংকিং লেনদেন এবং বিদেশে সম্পদ পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি তদন্তের আওতায় আসে।
এই মামলায় লন্ডনের বাকা হায়দারকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে লিডসের ৪৫ বছর বয়সী নাথান রিভার্সকে ২৭ মাসের স্থগিত কারাদণ্ড এবং কারফিউয়ের শর্ত দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকাশ্য কোর্ট তালিকায় মামলাটির সঙ্গে এই তিন নামের উপস্থিতি নিশ্চিত হলেও সাজা-সংক্রান্ত পূর্ণ বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো অপরাধলব্ধ অর্থকে সরাসরি ব্যাংকে জমা না দিয়ে মূল্যবান ধাতুর মাধ্যমে তার চরিত্র পরিবর্তনের চেষ্টা। বিপুল নগদ অর্থ স্বর্ণে রূপান্তরিত হলে অপরাধলব্ধ অর্থের প্রকৃত উৎস অনুসরণ করা তদন্তকারীদের জন্য আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অর্থপাচারকারীরা বৈধ ব্যবসা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাঠামো ব্যবহার করে কীভাবে অপরাধের অর্থকে বৈধ সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে—এই ঘটনাটি সেই ঝুঁকিকেই সামনে এনেছে। বিশেষ করে মূল্যবান ধাতু, স্ক্র্যাপ জুয়েলারি, বুলিয়ন ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্য অর্থপাচারের জন্য কীভাবে অপব্যবহৃত হতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাজ্যের Proceeds of Crime Act-এর অধীনে সংশ্লিষ্ট সম্পদ জব্দ বা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার কথা। এর মাধ্যমে অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থ বা সম্পদের কতটা রাষ্ট্র উদ্ধার করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই ঘটনা যুক্তরাজ্যের ব্যাংকিং খাতের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। বিপুল নগদ অর্থের অস্বাভাবিক প্রবাহ, স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু কেনার সঙ্গে সম্পর্কিত বড় লেনদেন, অসংগতিপূর্ণ ব্যবসায়িক চালান এবং আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ বা পণ্য স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, শুধু ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নজরদারি যথেষ্ট নয়। অর্থপাচারের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংক, মূল্যবান ধাতুর ব্যবসা, মানি-সার্ভিস প্রতিষ্ঠান, কাস্টমস, কর কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান আরও কার্যকর করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও আর্থিক চ্যানেলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারল এবং কোন পর্যায়ে সেটি শনাক্ত করা হয়েছিল। এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে যুক্তরাজ্যের আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সক্ষমতা—দুই দিকই স্পষ্ট করতে পারে।
বাকা হায়দারের নাম মামলার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণিত নির্দিষ্ট অপরাধের বাইরে অতিরিক্ত কোনো অপরাধ বা বৃহত্তর নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে—এমন দাবি করার ক্ষেত্রে আদালতের নথি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা জরুরি। প্রকাশ্য আদালত রেকর্ডে বাকা হায়দার, নাথান রিভার্স ও জশ অডসলির নামে মামলাটি নথিভুক্ত রয়েছে।
২৬ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডের এই অর্থপাচার কাণ্ড তাই শুধু একটি অপরাধী চক্রের বিচার নয়; এটি একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলছে—বিশ্বের অন্যতম বড় আর্থিক কেন্দ্র যুক্তরাজ্যের ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অপরাধলব্ধ অর্থ কতটা সহজে বৈধ সম্পদের রূপ নিতে পারে এবং ভবিষ্যতে সেই ঝুঁকি ঠেকাতে রাষ্ট্র ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
সূত্রঃ আইটিভি নিউজ
এম.কে

