ওমান উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহতের ঘটনায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২৩ বছর বয়সী ডেক ক্যাডেট আদিত্য শর্মাও রয়েছেন, যিনি হিমাচল প্রদেশের বাসিন্দা।
তবে এই ট্র্যাজেডির মাঝেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে তুমুল বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আদিত্যের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার ঠিক আগে তার বাবার করা পুরনো কিছু কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী ও উগ্র উসকানিমূলক পোস্ট ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
পালাউয়ের পতাকাযুক্ত তেল ট্যাঙ্কার ‘এমটি সেত্তেবেলো’-তে মার্কিন হামলার পর যখন আদিত্য নিখোঁজ ছিলেন, তখন তার বাবা রাজেশ শর্মা ছেলেকে খুঁজে পেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকুল আবেদন জানান। কিন্তু তার এই আবেগময় পোস্টগুলো নজরে আসতেই অনেক ব্যবহারকারী তার অতীতে করা বিভিন্ন ইসলামোফোবিক (মুসলিমবিদ্বেষী) মন্তব্যের স্ক্রিনশট শেয়ার করতে শুরু করেন।
ভাইরাল হওয়া পোস্টগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবরের একটি পোস্ট রয়েছে, যেখানে গাজায় ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে রাজেশ শর্মা লিখেছিলেনঃ
“আমি মনে করি ইসরায়েলের এখন পুরো গাজাকে জাতিগতভাবে নির্মূল করা উচিত এবং এটিকে একটি অমুসলিম অঞ্চলে পরিণত করা উচিত। সেখানে শান্তি বজায় রাখার এটাই একমাত্র উপায়।”
অন্য আরেকটি ২০২৪ সালের পোস্টে তিনি দাবি করেছিলেন যে, একবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পৃথিবীর সমস্ত মুসলিমকে হয় নির্মূল করা হবে নয়তো কোনো “শান্তিপূর্ণ ধর্মে” ধর্মান্তরিত করা হবে। এছাড়া হিজাব ও বোরকা পরিহিত মুসলিম নারীদের নিয়ে কটূক্তি এবং মুসলমানদের “শকুন” হিসেবে আখ্যা দেওয়ার মতো চরম আপত্তিকর পোস্টও সামনে এসেছে।
এই সমস্ত স্ক্রিনশট ফাঁসের পর নেটিজেনদের বড় একটি অংশ রাজেশ শর্মার তীব্র সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, যিনি অন্য একটি জাতির সম্পূর্ণ নির্মূল বা জাতিগত নিধন কামনা করেছিলেন, আজ তার নিজের সন্তান একটি সামরিক হামলার শিকার হওয়ার পর তিনি সহানুভূতি আশা করতে পারেন না।
ছেলের মৃত্যুর পর গভীরভাবে শোকাহত শর্মা পরিবার এখন এই হামলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জবাবদিহিতা দাবি করেছে। রাজেশ শর্মা গণমাধ্যমকে জানান, তার ছেলে আগেই জাহাজের সিনিয়র কর্মকর্তাদের দ্বারা হেনস্থা ও শোষণের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিল এবং এপ্রিল মাসেই জাহাজটি ছেড়ে দিতে চেয়েছিল।
একটি বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজে কেন এভাবে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজেশ শর্মা।
এটিকে একটি “যুদ্ধাপরাধ” আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি যেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। কোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে এভাবে ধ্বংস না করে তা থামানোর বা তল্লাশি করার অন্য উপায়ও ছিল।” আদিত্যের চাচা হিমাংশু শর্মাও এই ঘটনাকে “মানবতাবিরোধী অপরাধ” বলে বর্ণনা করেছেন এবং দ্রুত আদিত্যের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
বাণিজ্যিক জাহাজে এই ভয়াবহ হামলার ঘটনায় ভারত সরকার ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রশাসনের কাছে তীব্র আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ লিজ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, ওমান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচলকারী ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার ফলে ২১ জন ভারতীয় ক্রুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও আদিত্যসহ ৩ জন ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন-ইরান চলমান উত্তেজনার মাঝে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সূত্রঃ এনডিটিভি
এম.কে

