যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আর্থিক ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আগামী এক দশকের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল আবিবের সাম্প্রতিক নীতিগত মতপার্থক্যের মধ্যেই তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, “আমি এই মার্কিন সহায়তা বন্ধ করতে চাই। এটি অনেকটা দানের মতো এবং আমার মতে, এই সাহায্যের আর কোনো প্রয়োজন নেই।”
তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে ইসরায়েলের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা এখন জাতীয় অর্থনীতির তুলনায় খুবই সামান্য অংশ। তার ভাষায়, “আমাদের জিডিপির তুলনায় মার্কিন অর্থায়নের পরিমাণ এখন নিতান্তই নগণ্য। আমাদের নিজস্ব সম্পদ থেকেই পুরো ব্যয় নির্বাহ করার মতো যথেষ্ট আর্থিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।”
ইসরায়েল আদৌ এই সহায়তা ছাড়াই চলতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু দৃঢ়ভাবে বলেন, “হ্যাঁ।” তিনি জানান, একটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা গ্রহণ সম্পূর্ণ বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তার দাবি, ইসরায়েলের অর্থনীতি খুব শিগগিরই ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করবে। অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধি দেশটিকে নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয় বহনের সক্ষমতা দেবে।
তবে এটি প্রথমবার নয় যে নেতানিয়াহু এমন মন্তব্য করলেন। গত ১১ মে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘সিক্সটি মিনিটস’-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আর্থিক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। সেখানে তিনি জানান, এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করে আগামী এক দশকের মধ্যে সম্পন্ন করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-কেও নিজের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত ১০ বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক (MOU) কার্যকর রয়েছে। এর আওতায় ২০১৯ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলকে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সামরিক অর্থায়ন এবং প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং ও অ্যারো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া দেশগুলোর অন্যতম হলো ইসরায়েল।
নেতানিয়াহুর এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কূটনৈতিক বার্তা, নাকি সত্যিই ইসরায়েল দীর্ঘদিনের মার্কিন আর্থিক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নই সেই প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর দেবে।
সূত্রঃ চ্যানেল ১৪
এম.কে

