যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত অবৈধ অভিবাসীদের একটি অংশকে এখন উল্টো পথে ইউরোপে পাচার করছে মানবপাচারকারী চক্র। স্পেনের নতুন অভিবাসন নীতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে ফ্রান্স হয়ে স্পেনে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সক্রিয় হয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাচারকারীরা যুক্তরাজ্যের সীমান্ত ত্যাগের তুলনামূলক দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে অভিবাসীদের লরি বা ট্রাকের ভেতরে লুকিয়ে ফেরি কিংবা ইউরোটানেলের ট্রেনে করে ফ্রান্সে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে তাদের সড়কপথে স্পেনে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, এই যাত্রার জন্য প্রতিজনের কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার পাউন্ড নেওয়া হচ্ছে। আর ফ্রান্স থেকে স্পেন পর্যন্ত অতিরিক্ত পরিবহনের জন্য নেওয়া হচ্ছে আরও ৫০০ পাউন্ড।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে যেসব অভিবাসী ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করছেন অথবা অবৈধভাবে কাজ করার কারণে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদেরই প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে পাচারকারীরা। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক সাবেক শিক্ষার্থী ও ভিসা-ওভারস্টেয়ারদের উদ্দেশ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।
কিছু বিজ্ঞাপনে “UK to Spain”, “100% Safe” কিংবা “UK Student Visa Overstay” শিরোনাম ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি “Dunki Boys” নামে পরিচিত ভারতীয় তরুণদের লক্ষ্য করেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একাধিক অভিবাসীকে ট্রাকের ভেতরে গাদাগাদি করে বহন করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, কর্মস্থলে নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থায়ী বসবাসের (Indefinite Leave to Remain) জন্য অপেক্ষার সময় আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কারণে অনেক অবৈধ অভিবাসী ইউরোপে চলে যাওয়ার পথ খুঁজছেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Migration Observatory-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক পিটার ওয়ালশ বলেন, অনেক অভিবাসীর ধারণা, একবার শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সহজে চলাচল ও বসবাসের সুযোগ পাওয়া যাবে। তার মতে, যুক্তরাজ্যের তুলনায় ইউরোপে গোপনে টিকে থাকা সহজ বলে অনেকের বিশ্বাস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পেনের নতুন নিয়মের আওতায় ২০২৫ সালের শেষের আগে অন্তত পাঁচ মাস দেশটিতে বসবাসকারী এবং যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই, তারা এক বছরের জন্য নবায়নযোগ্য আবাসন অনুমতি ও কাজের অনুমোদন পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ আবেদনকারীর মধ্যে ৬ লাখের বেশি অস্থায়ী কর্মসংস্থানের অনুমতি পেয়েছেন।
এদিকে সম্প্রতি মরক্কো সীমান্তবর্তী স্পেনের সিউটা এনক্লেভে হাজারো অভিবাসীর প্রবেশের ঘটনাও ইউরোপজুড়ে নতুন করে অভিবাসন সংকট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ওই ঘটনার পর ইউরোপীয় নেতাদের কেউ কেউ সাময়িকভাবে স্পেনকে শেনজেন অঞ্চলের বাইরে রাখার আহ্বানও জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক পাচারকারী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান জোরদার করেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ডোভারে একটি লরির ভেতর ১১ জন ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত জাসকিরাত সিং নামের এক পাচারকারীকে ২০২৬ সালের জুনে ৫ বছর ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তদন্তে উঠে আসে, তিনি প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড আয় করেছিলেন এবং প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৬০ জন অভিবাসীকে ফ্রান্সে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন।
যুক্তরাজ্যের National Crime Agency (NCA) জানিয়েছে, একই চক্র যুক্তরাজ্যে অভিবাসী প্রবেশ করানো এবং দেশ থেকে বের করে নেওয়া—উভয় ধরনের পাচার কার্যক্রমে জড়িত। এসব নেটওয়ার্ক শুধু যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, বরং অভিবাসীদের জীবনকেও চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস জানিয়েছে, অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার দমনে তারা ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। সরকারের দাবি, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান, গ্রেপ্তার, দণ্ড এবং জব্দের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

