TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স আশ্রয়নীতি নিয়ে নতুন বিতর্কঃ সিরিয়াকে “নিরাপদ” বলায় সমালোচনা

ইউরোপের আশ্রয় ও অভিবাসন নীতিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যখন “ওয়ান ইন, ওয়ান আউট” চুক্তির আওতায় ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো এক সিরীয় আশ্রয়প্রার্থীকে তার নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে পড়তে হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, তার জন্য সিরিয়া “নিরাপদ”, যদিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনাটি ২৬ বছর বয়সী এক কুর্দি সিরীয় যুবককে ঘিরে, যিনি ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হন। ফ্রান্সে আশ্রয়ের আবেদন করার পর তা প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং জানানো হয়, তার নিজ দেশে ফিরে গেলে তার জীবনের জন্য কোনো গুরুতর ব্যক্তিগত ঝুঁকি নেই।

এই সিদ্ধান্তের ফলে তিনি এখন সিরিয়ায় ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, যা বিশেষজ্ঞদের মতে আন্তর্জাতিক শরণার্থী সনদের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। কারণ, ইউরোপীয় তালিকায় সিরিয়া এখনো “নিরাপদ দেশ” হিসেবে স্বীকৃত নয়।

ওই যুবক জানান, তিনি বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ এড়াতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার দাবি, স্থানীয় কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী তাকে জোর করে দলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। “আমি যুদ্ধ করতে চাইনি, কাউকে হত্যা করতে চাইনি,”—এমন মন্তব্য করে তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

দেশত্যাগের সময় তিনি তার মা ও ছোট ভাইবোনদের সঙ্গে পালিয়ে যান। কিন্তু সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় দালালদের মাধ্যমে তিনি পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি বলে জানান তিনি।

ফ্রান্সে তার আশ্রয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যেখানে তার ব্যক্তিগত তথ্য ও বসবাসের প্রমাণ যাচাই করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তার আবেদন গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি।
বর্তমানে তিনি মানসিক চাপে ভুগছেন এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। তার ভাষায়, “আমি নিয়ম মেনে আশ্রয় চেয়েছি, কিন্তু তা বাতিল হয়েছে। এখন কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।”

২০২৫ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া “ওয়ান ইন, ওয়ান আউট” চুক্তির লক্ষ্য ছিল ইংলিশ চ্যানেল হয়ে অবৈধভাবে আশ্রয়প্রার্থীদের আগমন কমানো। এই ব্যবস্থায় যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো একজনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয় এবং বিনিময়ে ফ্রান্স থেকে একজনকে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৫৬১ জনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং ৫৫১ জনকে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আনা হয়েছে। তবে একই সময়ে একদিনেই ৬০০-এর বেশি মানুষ ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর ঘটনা এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অভিবাসন আইনজীবী মহলের মতে, এই ধরনের প্রত্যাবর্তন নীতিতে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই এসব ব্যক্তি প্রকৃত শরণার্থী, যারা নিজ দেশে নির্যাতনের আশঙ্কায় পালিয়ে আসেন। তাদের পুনরায় এমন পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।

এদিকে অভিবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থা এই নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে প্রচারণা শুরু করেছে। ইতোমধ্যে হাজারো মানুষ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে আপত্তি জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই কাজ করছে এবং কোনো ব্যক্তিকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেরত পাঠানো হবে না। পাশাপাশি সিরিয়ায় ফেরত পাঠানোর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা জানিয়েছে তারা।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপের আশ্রয়নীতি, নিরাপদ দেশের সংজ্ঞা এবং মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্ন আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত আরও বড় রাজনৈতিক ও মানবিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

বাংলাদেশি সাইকেল এখন ব্রিটেনে—শুল্কমুক্ত সুবিধায় রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত

ব্রেক্সিটের পর মিলিয়ন পাউন্ডের বাণিজ্য শুল্ক

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির রেকর্ড