যুক্তরাজ্যের শ্রপশায়ারের স্টোক হিথ এলাকার বহুল আলোচিত তথাকথিত ‘মাইগ্র্যান্ট স্ট্রিট’-এ স্থানান্তরের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় নতুন বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার আবেদন জানিয়েছে পাকিস্তান থেকে আসা একটি আশ্রয়প্রার্থী পরিবার। পরিবারের দাবি, প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাস, নিরাপত্তাহীনতা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার অভাব তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
মুহাম্মদ নাদিম, তার স্ত্রী শামাইলা এবং তাদের চার সন্তান দুই বছর আগে পাকিস্তান ছেড়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেন। প্রথমে তারা গ্রেটার ম্যানচেস্টারের স্টকপোর্টে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। নাদিম কর্মভিসায় যুক্তরাজ্যে এসে উবার চালক হিসেবে কাজ করতেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তারা আশ্রয়ের আবেদন করলে আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের একটি হোটেলে রাখা হয়।
দুই সপ্তাহ আগে পরিবারটিকে স্টকপোর্ট থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে শ্রপশায়ারের স্টোক হিথের ডাটন ক্লোজে চার শয়নকক্ষবিশিষ্ট একটি নতুন নির্মিত বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। ওই এলাকায় মূলত সামাজিক আবাসনের জন্য নির্মিত ২১টি নতুন বাড়িতে মোট ৮৩ জন আশ্রয়প্রার্থীকে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেল ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বন্ধ করে তাদের আবাসিক বাড়ি ও সাবেক সামরিক স্থাপনায় স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ছোট গ্রামটিতে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থী বসবাস করলে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যেতে পারে।
এদিকে মুহাম্মদ নাদিম অভিযোগ করেছেন, নতুন বাড়িতে ওঠার পরদিন থেকেই তার পরিবার ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হয়েছে। তিনি জানান, একদিন তার স্ত্রী ও সন্তানরা বাড়ির বাইরে থাকাকালে তিনজন ব্যক্তি তাদের দিকে এগিয়ে আসে। পরে মুখোশ পরা একজনসহ দুই ব্যক্তি বাড়িতে এসে মোবাইল ফোনে তাদের ভিডিও ধারণ করে। ঘটনার পর বিষয়টি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সারকোকে জানানো হলে এলাকায় সার্বক্ষণিক নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়।
নাদিম জানান, তিনি ডায়াবেটিস ও দীর্ঘদিনের পিঠের ব্যথায় ভুগছেন। নতুন এলাকায় এখনো কোনো চিকিৎসকের নিবন্ধন করতে পারেননি। নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্যও কয়েক মাইল দূরে যেতে হয়। তার ভাষায়, শুধু একটি রুটি কিনতে গেলেও ট্যাক্সি ভাড়ায় প্রায় ২০ পাউন্ড খরচ হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, ছয় সদস্যের পরিবারের জন্য সরকার সপ্তাহে ২৯৫ পাউন্ড ভাতা দিলেও তার বড় অংশ যাতায়াত ব্যয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নাদিমের দাবি, তার সন্তানরা বাইরে খেলতে যেতে চাইলেও নিরাপত্তার আশঙ্কায় তিনি তাদের যেতে দিচ্ছেন না। পরিবারটি পার্কেও যায় না। দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্কের কারণে পুলিশ তাদের জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য ব্যক্তিগত অ্যালার্ম সরবরাহ করেছে।
পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এতটাই বেড়েছে যে, নাদিম এখন বাড়ির সামনের কক্ষেই রাত কাটান, যাতে কোনো বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
তিনি বলেন, পাকিস্তানে পারিবারিক বিরোধ, হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলের কারণে তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তাই কোনো অবস্থাতেই সেখানে ফিরে যেতে চান না। তবে তারা এমন জায়গায় থাকতে চান, যেখানে কাজ, স্কুল, চিকিৎসা ও সামাজিক যোগাযোগ সহজলভ্য থাকবে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা শুধু সবার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাই।”
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, ভবিষ্যতে আধুনিক নতুন আবাসন প্রকল্পে আশ্রয়প্রার্থীদের আর রাখা হবে না। তবে নতুন এই নীতিমালা কার্যকর হওয়ার আগেই স্টোক হিথের ওই আবাসন প্রকল্পে আশ্রয়প্রার্থীদের স্থানান্তর সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো সেই সিদ্ধান্তের আওতায় আসছে না।
সূত্রঃ দ্য এক্সপ্রেস
এম.কে

