যুক্তরাজ্যে কর্মস্থলে ইসলামি পোশাক পরার অধিকার নিয়ে করা এক মুসলিম স্বাস্থ্যকর্মীর ধর্মীয় বৈষম্য ও হয়রানির অভিযোগ খারিজ করেছে কর্মসংস্থান ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীর পরিধেয় পোশাক রোগী ও কর্মীদের চলাচলের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং কর্মস্থলের নির্ধারিত পোশাকবিধি মানতে তার অনীহাই বিরোধের মূল কারণ ছিল।
নাজিয়া আয়ুব নামের ওই স্বাস্থ্যকর্মী ২০২১ সালের মার্চ থেকে নর্দার্ন কেয়ার অ্যালায়েন্স এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টে স্বাস্থ্যসেবা সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি দীর্ঘমেয়াদি ভেন্টিলেশন প্রয়োজন এমন শিশুদের পরিচর্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মুসলিম হিসেবে ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি মাথায় স্কার্ফের পাশাপাশি ‘জিলবাব’ ধরনের দীর্ঘ ইসলামি পোশাক পরতেন। পোশাকটি ঘাড় থেকে গোড়ালি পর্যন্ত শরীর ঢেকে রাখে এবং শরীরের আকৃতি আড়াল করে। তবে ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়, কর্মস্থলের নির্ধারিত ইউনিফর্মের পরিবর্তে এই পোশাক পরার কারণে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
২০২৩ সালের মে মাসে তার লাইন ম্যানেজার ওয়েন্ডি বেকন তাকে জানান, তিনি কর্মস্থলের নির্ধারিত ট্রাউজারের পরিবর্তে কাজের টিউনিকের নিচে লম্বা কালো পোশাক পরছেন। আয়ুব তখন জানতে চান, তার ম্যানেজারের মুসলিম পোশাক নিয়ে কোনো সমস্যা আছে কি না। ম্যানেজার জানান, ধর্মীয় পোশাক নিয়ে তার আপত্তি নেই; তবে কর্মস্থলের নির্ধারিত ইউনিফর্ম নীতিমালা অনুসরণ করা তার দায়িত্ব।
এরপর কর্মীদের উদ্দেশে কর্মস্থলের পোশাকবিধি স্মরণ করিয়ে একটি ই-মেইল পাঠানো হয়। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে আয়ুব অভিযোগ করেন যে তার পরিমিত পোশাক পরার ধর্মীয় পছন্দের কারণে তিনি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে সহকারী নার্সিং সার্ভিসেস পরিচালক লিসা ফার্নের সঙ্গে বৈঠকে আয়ুব জানান, তিনি চান না তার শরীরের আকৃতি বা অবয়ব দৃশ্যমান হোক এবং তিনি নিজেকে কর্মস্থলে ‘বুলিড’ মনে করছেন।
পরবর্তী মাসে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা সতর্ক করেন, তার পোশাক রোগী বা সরঞ্জাম স্থানান্তরের সময়, সিঁড়ি ব্যবহার কিংবা রোগীর পরিচর্যার কাজে চলাফেরার ক্ষেত্রে পিছলে যাওয়া, হোঁচট খাওয়া বা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে আয়ুব তার অভিযোগে অনড় থাকেন। তিনি লিখিতভাবে জানান, ইসলামি পোশাকের কোনো বিকল্প নেই। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ধর্মীয় পোশাক পরিবর্তন করে অন্যদের সন্তুষ্ট করার কোনো ইচ্ছা তার নেই এবং তিনি পোশাক নিয়ে আর আলোচনা করতে চান না।
এদিকে ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ তাকে বিকল্প পোশাকের সুযোগ দেয়। এর মধ্যে ট্রাউজারসহ অন্যান্য নির্ধারিত পোশাকের বিকল্পও ছিল। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে আয়ুব জানান, ঢিলেঢালা হলেও কোনো ধরনের ট্রাউজার তার কাছে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়; তার জন্য লম্বা স্কার্ট বা পোশাক পরা অপরিহার্য।
পোশাকবিধি না মানলে তা অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—এমন সতর্কতাও তাকে দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর মানসিক চাপ ও উদ্বেগের কারণে তিনি অসুস্থতাজনিত ছুটিতে যান।
এদিকে কর্মস্থলে তার অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হয়। সহকর্মীদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগেরও তদন্ত করা হয়। ট্রাইব্যুনালের নথি অনুযায়ী, রোগীর বাড়িতে কয়েকজন কর্মীর পোশাকবিধি নিয়ে আলোচনার একটি ঘটনা সামনে আসে, যেখানে একজন সহকর্মী তার অভিযোগকে ‘race card’ ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বলে শুনানিতে উঠে আসে। তবে এ ঘটনায়ও আয়ুবের অভিযোগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং তার আপিলও খারিজ হয়।
পরে আয়ুব অন্যত্র বদলি চাইলেও মধ্যস্থতার প্রস্তাব একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ শুরু করেন এবং চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন।
ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত কর্মসংস্থান ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে এমপ্লয়মেন্ট জাজ রেবেকা ইলি আয়ুবের ইসলামি পোশাককে ‘উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে বিবেচনা করেন। বিচারকের মতে, আয়ুব মূলত কর্মস্থলের নির্ধারিত পোশাকবিধি মেনে নেওয়ার পরিবর্তে নিজের পছন্দের পোশাক পরার অনুমতি চেয়েছিলেন।
রায়ে বিচারক বলেন, আয়ুবের মূল উদ্বেগ ছিল নির্ধারিত ইউনিফর্মের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী পোশাক পরতে না পারা এবং ব্যবস্থাপনা তার ধর্মীয় অনুশীলন নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
ট্রাইব্যুনাল তার ধর্মীয় বৈষম্য ও হয়রানির অভিযোগসহ অন্যান্য দাবিও খারিজ করে দেয়।
তবে রায়ের সঙ্গে একমত নন আয়ুব। তিনি দাবি করেছেন, ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত অন্যায্য এবং তার পোশাককে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ঝুঁকি বলা হলেও এর পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ দেখানো হয়নি। তার দাবি, চাকরির প্রথম প্রায় আড়াই বছর তিনি একই ধরনের ইসলামি পোশাক পরেই কাজ করেছেন এবং তখন কোনো সমস্যা তৈরি হয়নি।
আয়ুব আরও বলেন, তাকে যে বিকল্প পোশাক পরতে বলা হয়েছিল, সেগুলো তিনি নিজের বাড়িতেও পরতেন না; ফলে কর্মস্থলে কেন তা পরবেন—এ প্রশ্নও তিনি তুলেছেন।
তার ভাষায়, বিষয়টি ধর্মকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করার নয়; বরং সবার জন্য সমতা ও বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার প্রশ্ন। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে তার নতুন একটি চাকরি রয়েছে এবং ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।
নর্দার্ন কেয়ার অ্যালায়েন্স এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সালফোর্ড রয়্যাল, রয়্যাল ওল্ডহ্যাম, রচডেল ইনফার্মারি এবং ফেয়ারফিল্ড জেনারেল—এই চারটি হাসপাতাল পরিচালনা করে।
ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা খাতে ধর্মীয় স্বাধীনতা, কর্মস্থলের পোশাকবিধি এবং রোগী ও কর্মীদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সূত্রঃ ডেইলি মেইল
এম.কে

