মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে ব্রিটেনের জন্য একটি কঠিন শীতকাল এগিয়ে আসছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও দেশটির জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পরিচালনাকারী সংস্থা ন্যাশনাল এনার্জি সিস্টেম অপারেটর (NESO) জানিয়েছে, আসন্ন শীত মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরাপদ থাকবে, তবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং জ্বালানি বিলের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
NESO-এর সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, শীতকালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ও প্রায় ৫ দশমিক ৫ গিগাওয়াট অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকবে। যা সম্ভাব্য সর্বোচ্চ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ফলে ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের মতো বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কা আপাতত নেই।
তবে পরিস্থিতির অন্য দিকটি উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তারের কারণে বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এরই প্রভাবে আগামী জুলাই থেকে যুক্তরাজ্যে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন জ্বালানি মূল্যসীমার (এনার্জি প্রাইস ক্যাপ) কারণে গড় বার্ষিক জ্বালানি বিল প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও সেই বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে পরিবারগুলোকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই ব্রিটেনের জন্য ভয়াবহ সময়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ কয়েক বছর আগে ইউক্রেন যুদ্ধের পর গ্যাসের দাম বৃদ্ধিই দেশটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবারও একই ধরনের চাপ ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে ব্রিটেনের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কম আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। শীতকালে যখন বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদন কমে যায়, তখন গ্যাসের ওপর নির্ভরতা আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দামের যেকোনো পরিবর্তন সরাসরি যুক্তরাজ্যের জ্বালানি ব্যয়ে প্রভাব ফেলে।
NESO জানিয়েছে, তারা শীতকালীন পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য প্রতিদিনের ভিত্তিতে ৩০ হাজারেরও বেশি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। আবহাওয়া, বিদ্যুতের চাহিদা, বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এ মূল্যায়ন করা হয়েছে।
সংস্থাটির হোল এনার্জি সিস্টেম রেজিলিয়েন্স বিভাগের পরিচালক ডেবোরাহ পেটারসন বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা থাকলেও পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে আশ্বস্ত থাকতে পারে। তাদের মতে, বর্তমান বিদ্যুৎ মজুত ২০২২ সালের সংকটকালের তুলনায় বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে জ্বালানি খাতের সংগঠন এনার্জি ইউকের প্রধান নির্বাহী ধারা ব্যাস সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এখনও ব্রিটিশ পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে যে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা সরাসরি ব্রিটিশদের জ্বালানি বিল বাড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের জ্বালানি ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ হলেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্য অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে হলে দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে। বায়ু বিদ্যুৎ, সৌরশক্তি এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণই ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরাপদ থাকলেও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাড়তি জ্বালানি বিলের কারণে আসন্ন শীতকাল ব্রিটিশ পরিবারগুলোর জন্য নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সেই চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্রঃ স্কাই নিউজ
এম.কে

