17.7 C
London
September 9, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)শীর্ষ খবর

যুক্তরাজ্যে বিমান চলাচলে ভয়াবহ বিপর্যয়ঃ বাতিল ১,৭৫০ ফ্লাইট

যুক্তরাজ্যে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটির পর দেশটির বিমান যোগাযোগে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবারের সমস্যার প্রভাব বুধবারও অব্যাহত থাকায় শত শত ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়েছে। এতে কয়েক লাখ যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন এবং অনেককে বিমানবন্দরেই রাত কাটাতে হয়েছে।
বিমান চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের হিসাবে, মঙ্গলবার প্রায় ১ হাজার ৭৫০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর ফলে কয়েক লাখ যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুধবারও নতুন করে শত শত ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়েছে।
সমস্যার কেন্দ্র ছিল যুক্তরাজ্যের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ সেবা প্রদানকারী ন্যাটসের ফ্লাইট প্রসেসিং ব্যবস্থায় দেখা দেওয়া একটি কারিগরি ত্রুটি। ন্যাটস পরে জানায়, সমস্যাটি সমাধান করা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিমান ও ক্রু নির্ধারিত অবস্থানের বাইরে চলে যাওয়ায় বিমান চলাচলের স্বাভাবিক সূচিতে বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ বুধবার জানিয়েছে, মঙ্গলবারের বিপর্যয়ের পর বিমান ও ক্রু বিভিন্ন জায়গায় আটকে পড়ায় আরও ১৯০টি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার এয়ারলাইনটি ২৬০টি ফ্লাইট বাতিল করেছিল। নতুন সূচি তৈরি করতে সারা রাত কাজ করেও পরিস্থিতি পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে তারা।
রায়ানএয়ার জানিয়েছে, মঙ্গলবার তাদের ৬৫ হাজারের বেশি যাত্রী সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বের শিকার হয়েছেন। বিপর্যয়ের কারণে ইউরোপের ব্যস্ত বিমান চলাচল ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব পড়ে এবং যাত্রীদের একটি বড় অংশ নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি।
বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের দুর্ভোগের চিত্রও সামনে এসেছে। তুরস্কের দালামান বিমানবন্দর থেকে ম্যানচেস্টারগামী একটি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর ব্ল্যাকপুলের একটি পরিবারকে বিমানবন্দরের মেঝেতে রাত কাটাতে হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা খুব সামান্য ঘুমাতে পেরেছেন এবং তাদের কাছে কম্বল বা বালিশও ছিল না। আশপাশে আরও অনেক পরিবার একই পরিস্থিতিতে আটকে ছিল।
লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক যাত্রী জানান, বাতিল হওয়া বিভিন্ন ফ্লাইটের লাগেজ একটি মাত্র ব্যাগেজ সংগ্রহের বেল্টে পাঠানো হয়েছিল। ফলে প্রায় এক হাজার মানুষ একই জায়গায় নিজেদের লাগেজ সংগ্রহের জন্য জড়ো হন। ওই যাত্রী ব্যাগেজ সংগ্রহের এলাকাটির পরিস্থিতিকে ‘নৈরাজ্যপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেন।
লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরেও ব্যাপক ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়। বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী এয়ারনাভ রাডারের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার হিথ্রোতে ৩৬২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছিল। বুধবার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফ্লাইট চলাচল পুনরুদ্ধার হচ্ছে, তবে বিমান ও ক্রু পুনর্বিন্যাসের কারণে আরও কিছু বিঘ্ন ঘটতে পারে।
গ্যাটউইক বিমানবন্দর জানিয়েছে, ফ্লাইট চলাচল আবার শুরু হয়েছে, কিন্তু কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। যাত্রীদের সর্বশেষ তথ্যের জন্য নিজ নিজ এয়ারলাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ম্যানচেস্টার বিমানবন্দর জানিয়েছে, সেখানে কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। ব্রিস্টল, বার্মিংহাম, স্ট্যানস্টেড ও কার্ডিফ বিমানবন্দরেও পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরেছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে বিলম্ব ও বাতিল অব্যাহত রয়েছে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল কারিগরি সমস্যা সমাধান হলেও এর প্রভাব দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ বিমান, পাইলট ও ক্রুরা এখন বিভিন্ন বিমানবন্দরে ছড়িয়ে পড়েছেন। কোনো বিমান বা ক্রু নির্ধারিত স্থানে না থাকায় পরবর্তী একাধিক ফ্লাইটের সূচিতেও এর প্রভাব পড়ে। এ কারণে কোনো কোনো এয়ারলাইনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ সাইমন ক্যাল্ডারের হিসাবে, মঙ্গলবারের বিপর্যয়ের কারণে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ এমন জায়গায় রাত কাটিয়েছেন যেখানে তাদের থাকার কথা ছিল না। তার মতে, মূল সমস্যা সমাধান হলেও বিমান, ক্রু ও যাত্রীদের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে অনেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে সপ্তাহান্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন।
ন্যাটসের প্রধান নির্বাহী মার্টিন রলফ যাত্রীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং ঘটনার দায় ও দায়িত্ব স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ন্যাটস সমস্যাটি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সাইবার হামলাকে কারণ হিসেবে বাতিল করা হয়েছে।
রলফের দাবি, ন্যাটসের ব্যবস্থাগুলো কার্যকর এবং প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত অবস্থায় রয়েছে। তিনি জানান, গত ২৫ বছরে ন্যাটস প্রযুক্তিতে ১ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি বিনিয়োগ করেছে। তবে এমন ঘটনা যাত্রীদের জন্য হতাশাজনক ও কষ্টদায়ক হয়েছে বলে স্বীকার করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
ঘটনার পর যুক্তরাজ্যের পরিবহনমন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডার ন্যাটসের প্রধান নির্বাহী মার্টিন রলফকে বৈঠকে তলব করেছেন। বিমান চলাচলে এত বড় বিপর্যয় কেন ঘটল, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা চাইবেন।
এদিকে ফ্লাইট বাতিল বা দীর্ঘ বিলম্বের শিকার যাত্রীদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ফ্লাইট বাতিল হলে এয়ারলাইনকে যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হয় অথবা অর্থ ফেরতের সুযোগ দিতে হয়। দীর্ঘ বিলম্বের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ও অপেক্ষার সময় অনুযায়ী খাবার বা হোটেলে থাকার সুবিধাও প্রযোজ্য হতে পারে। তবে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো এয়ারলাইনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সমস্যার কারণে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ সাধারণত থাকে না।
বিমান চলাচলের মূল কারিগরি ত্রুটি সমাধান হলেও মঙ্গলবারের বিপর্যয়ের ফলে তৈরি হওয়া বিশাল ব্যাকলগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দরে বুধবারও যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা, ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে নিজ নিজ এয়ারলাইনের কাছ থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বেনিফিটভোগীদের জীবন রক্ষায় কঠোর সুরক্ষার দাবি

দুর্নীতিবিরোধী মন্ত্রী নিজেই দুর্নীতিবাজ, টিউলিপ প্রসঙ্গে মাস্ক

বিতর্কের মুখে ব্রিটিশ রাজা চার্লস ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী উইলিয়াম