২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ক্ষেত্রে দ্বৈত ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য নতুন ভ্রমণ নথির নিয়ম কার্যকর হয়েছে। এখন শুধু অন্য দেশের বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফেরার সুযোগ আর আগের মতো নেই। ব্রিটিশ নাগরিকদের ভ্রমণের সময় বৈধ ব্রিটিশ পাসপোর্ট অথবা ‘সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্ট’ দিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাসের অধিকার প্রমাণ করতে হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবের মুখে পড়ে একটি পরিবারকে ইতালিতে ১২ দিন আটকে থাকতে হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইতালীয় নাগরিক মারিকা ভেরোকা তার চার বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে ইতালি থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরার সময় বিমানযাত্রায় বাধার মুখে পড়েন। শিশুটির কাছে শুধু ইতালীয় পাসপোর্ট থাকায় তাকে বিমানে উঠতে দেওয়া হয়নি।
পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে ভেরোকাকে তার পরিবারকে ইতালিতে রেখে একাই যুক্তরাজ্যে ফিরে আসতে হয়। পরে ছেলেকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় জরুরি নথিপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় পরিবারটি আরও ১২ দিন ইতালিতে আটকে থাকে।
নতুন নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের ভ্রমণের আগে তাদের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বা যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অধিকার যাচাই করা। ব্রিটিশ নাগরিকরা সাধারণভাবে ইলেকট্রনিক
ভ্রমণ অনুমতিপত্রের আওতাভুক্ত নন। ফলে অন্য দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করলেও তাদের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথি থাকতে হবে।
এর আগে অনেক দ্বৈত নাগরিক, বিশেষ করে যাদের দ্বিতীয় দেশের নাগরিকত্ব এমন দেশের যেখানে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের জন্য ভিসা প্রয়োজন হতো না, তারা শুধু বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করেই যুক্তরাজ্যে যাতায়াত করতেন। নতুন ব্যবস্থায় সেই দীর্ঘদিনের প্রচলিত সুবিধা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী সবচেয়ে সহজ উপায় হলো বৈধ ব্রিটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করা। তবে ব্রিটিশ পাসপোর্ট না থাকলে বিদেশি পাসপোর্টের সঙ্গে ‘সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্ট’ ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে এই সনদ ডিজিটাল পদ্ধতিতেও দেওয়া হচ্ছে এবং এটি যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অধিকার প্রমাণ করে।
তবে এই বিকল্প ব্যবস্থাও ব্যয়বহুল। ব্রিটিশ সংসদের গবেষণা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ‘সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্ট’-এর ফি ৫৮৯ পাউন্ড। পাশাপাশি আবেদন প্রক্রিয়ায় সময়ও লাগতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নিয়মটি সম্পর্কে অনেক দ্বৈত নাগরিকের পর্যাপ্ত সচেতনতা না থাকায়। ব্রিটিশ সরকার বলছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকেই দ্বৈত নাগরিকদের বৈধ ব্রিটিশ পাসপোর্ট অথবা ‘সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্ট’ নিয়ে ভ্রমণের বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল। তবে ব্রিটিশ সংসদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক দ্বৈত নাগরিক ২০২৬ সালের শুরুতে গণমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আসার আগে এই পরিবর্তন সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রী বিমানে ওঠার আগেই প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি যাচাই করতে হয়। কোনো দ্বৈত নাগরিক নিজের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারলে বিমান সংস্থা তাকে বিমানে উঠতে না-ও দিতে পারে। ফলে বিদেশে থাকা পরিবারগুলো ব্রিটিশ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় নথি ছাড়া হঠাৎ ভ্রমণ সংকটে পড়তে পারে।
এ ধরনের ঘটনায় শুধু মানসিক ভোগান্তিই নয়, বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। ফ্লাইট বাতিল বা পুনরায় বুকিং, জরুরি নথি সংগ্রহ এবং অতিরিক্ত থাকা-খাওয়ার খরচ মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ব্যয় কয়েক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে পরিবহন সংস্থাগুলোকে সীমিত সময়ের জন্য বিকল্প নথি গ্রহণের বিষয়ে বিশেষ বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সংসদের গবেষণা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ১৯৮৯ সালের পর ইস্যু করা মেয়াদোত্তীর্ণ ব্রিটিশ পাসপোর্টের সঙ্গে বৈধ বিদেশি পাসপোর্ট থাকলে কিছু পরিবহন সংস্থা নিজস্ব বিবেচনায় যাত্রীকে বিমানে উঠতে দিতে পারে। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয় এবং এর ওপর নির্ভর করে ভ্রমণ পরিকল্পনা করা নিরাপদ নয়।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষ্পত্তি প্রকল্পের আওতায় ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাওয়া কিছু ব্যক্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের যুক্তরাজ্যের ভিসা-অবস্থা বৈধভাবে যুক্ত থাকলে বিদেশি পাসপোর্ট বা গ্রহণযোগ্য পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভ্রমণের সুযোগ থাকতে পারে।
ইতালিতে আটকে পড়া এই পরিবারের ঘটনা তাই শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি বিশ্বজুড়ে বসবাসকারী ব্রিটিশ দ্বৈত নাগরিকদের জন্য নতুন ভ্রমণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে ফেরার অভ্যাস থাকা নাগরিকদের ভ্রমণের আগে নিজেদের ব্রিটিশ পাসপোর্টের মেয়াদ এবং প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে দ্বৈত নাগরিক পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। কোনো শিশু ব্রিটিশ নাগরিক হলে তার জন্যও প্রয়োজনীয় ব্রিটিশ ভ্রমণ নথি বা উপযুক্ত ‘সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্ট’ আগে থেকে নিশ্চিত না করলে বিদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরার সময় পরিবারকে বড় ধরনের জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব নির্দেশনাতেও দ্বৈত নাগরিকদের সন্তানদের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব যাচাই করে প্রয়োজনীয় নথির জন্য আগাম আবেদন করার কথা বলা হয়েছে।
সূত্রঃ গভ.ইউকে
এম.কে

