দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র ডেভিড মেনসার। তিনি মিলিব্যান্ডকে ‘ব্যর্থ ব্যক্তি’ এবং ‘একটি হাস্যকর চরিত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ডেভিড মেনসার বলেন, ইসরায়েলে এড মিলিব্যান্ডকে কেউ দেখতে চায় না। তার দাবি, ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তগুলো আন্তর্জাতিক নীতির চেয়ে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
মেনসার মিলিব্যান্ডের রাজনৈতিক অতীত এবং তার নেট জিরো নীতিরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, মিলিব্যান্ডের নেট জিরো নীতি এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছিল হাস্যকর। তার অভিযোগ, মিলিব্যান্ডের নেতৃত্বে ব্রিটেন এমন একটি পথে যাচ্ছে, যার ফলে দেশটির আন্তর্জাতিক প্রভাব কমে যাচ্ছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র ব্রিটেনের বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে ফ্রান্সের তুলনা করে বলেন, ব্রিটেন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে দেশটি বিরক্তিকর হলেও শেষ পর্যন্ত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে।
এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের নেওয়া নতুন পদক্ষেপ। ব্রিটিশ সরকার পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট পণ্য ও কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বসতি সম্প্রসারণে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ঠেকানো এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা ধরে রাখাই এই পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্রিটেনকে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। মানুষের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদের মতো পরিস্থিতিতে ব্রিটেন দুর্বল পক্ষের পাশে থাকবে বলেও তিনি জানান।
তবে যুক্তরাজ্যের ইহুদি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। প্রধান রাব্বি স্যার এফ্রাইম মিরভিস সতর্ক করে বলেছেন, এমন পদক্ষেপ ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
জিউইশ লিডারশিপ কাউন্সিল অভিযোগ করেছে, সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যত ইসরায়েলকে বয়কটের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সংগঠনটি দাবি করেছে, সরকার রাজনৈতিকভাবে চরম অবস্থান নেওয়া কিছু গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে।
বোর্ড অব ডেপুটিজ অব ব্রিটিশ জিউজও রোশ হাশানার ঠিক আগে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এর সম্ভাব্য নিরাপত্তাগত প্রভাবের কথা জানিয়েছে।
তবে এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে এড মিলিব্যান্ড বলেন, যুক্তরাজ্যে ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে আরও কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্রিটিশ মূল্যবোধের পক্ষে অবস্থান নেওয়াও জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কমিউনিটি সিকিউরিটি ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যে ইহুদিবিরোধী বিদ্বেষমূলক ১ হাজার ৯২৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ২১ শতাংশ বেশি।
যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার পর ইসরায়েলও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দিয়েছে এবং কয়েকজন ব্রিটিশ এমপি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ওপর ইসরায়েলে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
ইসরায়েলের প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের ইসরায়েলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করেছেন। এসব সংগঠনের মধ্যে অক্সফাম, সেভ দ্য চিলড্রেন, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, ইসলামিক রিলিফ ওয়ার্ল্ডওয়াইড এবং মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানসের নাম রয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার বলছে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই তাদের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য।
পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের এই সংঘাতের ফলে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি পাল্টা কূটনৈতিক ও ভ্রমণসংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়ায় বিরোধটি এখন দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস
এম.কে

