14.5 C
London
September 8, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের চাপ উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনের পক্ষে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পথে এগোচ্ছে যুক্তরাজ্য। এ অবস্থানের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং ব্রিটিশ রক্ষণশীল মহলের চাপের মুখে নিজের অবস্থানে অনড় থাকায় তাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম দৃঢ়চেতা ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ব্রিটিশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মঙ্গলবার ইসরাইলি অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরামর্শমূলক রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। ওই রায়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখলদারিত্বকে অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল।

মিলিব্যান্ডের পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তুলেছেন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মিলিব্যান্ড নিজেও ইহুদি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ব্রিটেনের বর্তমান নীতির সমালোচনা করে দেশটিকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’রও সতর্ক করে বলেছেন, ব্রিটেন ইসরাইলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে ইসরাইলও ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

এদিকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কিত এই উত্তেজনার মধ্যে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু ফকল্যান্ড নিয়ে ব্রিটেনের বিরোধিতা করে আর্জেন্টিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সমর্থন নাও করতে পারে।

মিলিব্যান্ডের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে ব্রিটিশ রক্ষণশীল বিরোধী দল ও দেশটির ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমের একটি অংশও। ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম টুগেনহাট ইসরাইলের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দাবি করেছেন, ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ‘কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব ইসরাইল’ও এই পরিকল্পনাকে নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং ইসরাইলকে এককভাবে নিশানা করার পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তবে এসব চাপ ও সমালোচনার মধ্যেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি মিলিব্যান্ড। পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেওয়া প্রথম বক্তব্যে তিনি বলেন, ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না। গাজার পরিস্থিতি নিয়েও তিনি আগের তুলনায় আরও কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন। গাজায় থাকা মানুষের সঙ্গে বৈঠকের পর সেখানকার পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করে তিনি জানান, ব্রিটিশ সরকারকে আরও দৃঢ় ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

ব্রিটিশ সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, ইসরাইলি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত পদক্ষেপের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি মিলিব্যান্ড নিজেই। তার আগের দুই লেবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ও ইয়েভেট কুপার গাজার পরিস্থিতি নিয়ে কঠিন ব্রিফিং পেলেও মিলিব্যান্ডের মতো প্রকাশ্য ও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাননি বলে সূত্রটি দাবি করেছে। একজন লেবার সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ও মিলিব্যান্ড ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্রিটিশ সরকারের নীতিতে ‘ব্যাপক পরিবর্তন’ আনার বিষয়টি সামনে আনতে যাচ্ছেন।

ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবি হলো ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কার্যকরভাবে এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু পণ্য আমদানি বন্ধ করলেই হবে না; বসতিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং বিনিয়োগও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে শক্তিশালী আইনগত কাঠামো।

ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ইসরাইলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। আয়ারল্যান্ড, স্পেন ও বেলজিয়াসহ কয়েকটি দেশ বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তবে ব্রিটিশ সরকারি সূত্রগুলোর দাবি, যুক্তরাজ্যের পরিকল্পিত নিষেধাজ্ঞা এসব উদ্যোগের তুলনায় আরও কঠোর হতে পারে।

ইসরাইলের নতুন ‘ই১’ বসতি প্রকল্প নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। পূর্ব জেরুজালেমের কাছে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অধিকৃত পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ও কার্যকর একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের প্রশ্নটি এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

মিলিব্যান্ডের অবস্থান নিয়ে ইসরাইলপন্থী সমালোচকেরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, ব্রিটেনের মুসলিম জনগোষ্ঠীর চাপের কারণেই তিনি ফিলিস্তিনের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা জনমত জরিপগুলো এ দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ দেয় না। একটি জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১৬ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেন। লেবার পার্টির ১৪০ জনের বেশি এমপিও বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে লেবার সদস্যদের মধ্যে পরিচালিত একটি জরিপে ৮৭ শতাংশ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে মিলিব্যান্ডের অবস্থান শুধু লেবার পার্টির একটি অংশের দাবি নয়, ব্রিটিশ জনমতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সঙ্গেও তার অবস্থানের মিল রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে মিলিব্যান্ডের বর্তমান অবস্থান অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ সালে লেবার নেতা থাকাকালে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের ইসরাইলি সামরিক অভিযানের বিষয়ে ‘নীরবতা’র সমালোচনা করে তিনি ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনায় সরকারের অবস্থানকে ভুল বলে মন্তব্য করেন। একই বছর তিনি একতরফাভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষেও অবস্থান নেন।

গত বছরও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগকারী মন্ত্রীদের মধ্যে মিলিব্যান্ড অন্যতম ছিলেন বলে সরকারি সূত্রের দাবি। ফলে তার বর্তমান অবস্থানকে হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

মিলিব্যান্ডের সাম্প্রতিক উদ্যোগ তাই শুধু ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। রক্ষণশীল সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ইসরাইলবিষয়ক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্রিটেনের অবস্থান সমালোচিত হয়েছিল। স্টারমার সরকারের আমলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কিছু সীমিত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার পথে যায়নি ব্রিটেন।

অস্ত্র রপ্তানিতে সীমিত নিষেধাজ্ঞা এবং গাজা নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপের পর এবার ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা ব্রিটিশ নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রিটেনের ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠ পররাষ্ট্রনৈতিক সম্পর্কও নতুন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।

সূত্রঃ মিডল ইস্ট আই

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে সময়মতো কর না দিলে £১,৬০০ পর্যন্ত জরিমানা ও সুদের বোঝাঃ এইচএমআরসি’র সতর্কবার্তা

বার্মিংহামে মুসল্লির গায়ে আগুন, অভিযুক্ত আটক

যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রীর আসন টলাতে লেবার দলের অভ্যন্তরে তৎপরতা চরমে

নিউজ ডেস্ক