TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁপছে যুক্তরাজ্যঃ এবার স্যোশাল বেনিফিট কাটার প্রস্তাব কনজার্ভেটিভ পার্টির

যুক্তরাজ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেডেনক ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা সামনে এনেছেন। এই অতিরিক্ত অর্থের একটি বড় অংশ কল্যাণভাতা কমিয়ে সংগ্রহ করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

কেমি বেডেনকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আবাসনভাতা সংস্কারের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ কোটি পাউন্ড এবং দুই-সন্তান সুবিধার সীমা পুনরায় চালু করে আরও প্রায় ৩০০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয় করা যেতে পারে। দ্য সানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

কেমি বেডেনক এই পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এবং অর্থমন্ত্রী জন হিলির ওপর সরাসরি চাপ বাড়িয়েছেন। তার দাবি, দেশের প্রতিরক্ষা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ব্রিটেনকে সামরিকভাবে আরও প্রস্তুত হতে হবে।

তিনি বলেছেন, প্রতিটি সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা এবং কনজারভেটিভরা সবসময় প্রতিরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে এই অতিরিক্ত অর্থ কোথা থেকে আসবে—কর বাড়ানো হবে, নাকি কল্যাণভাতায় আরও কাটছাঁট করা হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। সরকার জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পথ ও ৩ শতাংশের লক্ষ্য পূরণের সময়সীমা আগামী বসন্তের ব্যয় পর্যালোচনায় আরও পরিষ্কার করা হবে।

অর্থমন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছেন, আগামী বসন্তের ব্যয় পর্যালোচনায় ন্যাটোর ২০৩৫ সালের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য একটি স্পষ্ট পথ তুলে ধরা হবে। একই প্রক্রিয়ায় ৩ শতাংশে পৌঁছানোর নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হবে।

তবে এই লক্ষ্য অর্জন ব্রিটিশ সরকারের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। রয়টার্সের হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ শতাংশে পৌঁছাতে অতিরিক্ত প্রায় ১৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ড প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনাতেও প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ডের অর্থঘাটতি রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কনজারভেটিভদের প্রস্তাব সরাসরি সাধারণ মানুষের কল্যাণমূলক সুবিধার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আবাসন সহায়তা এবং সন্তানসংখ্যাভিত্তিক সুবিধা সীমিত করার প্রস্তাব নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে কনজারভেটিভদের যুক্তি হলো, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ অপরিহার্য। বেডেনক প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সরকারের বর্তমান অবস্থানকে অপর্যাপ্ত বলে আক্রমণ করছেন।

এই বিতর্কের মধ্যেই ব্রিটেনের সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি নিয়েও কনজারভেটিভ নেতৃত্ব সতর্কবার্তা দিয়েছে। বেডেনক বলেছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্য বিশ্বের অন্যতম বড় পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে তার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ব্রিটেনের মিত্র দেশগুলোও সামরিক ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বেডেনক আরও বলেছেন, ব্রিটেন যদি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যথাযথভাবে অর্থায়ন করতে চায়, তাহলে শক্তিশালী অর্থনীতি প্রয়োজন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তিনি দেশের নিরাপত্তা ব্যয়কে অভ্যন্তরীণ কল্যাণমূলক কর্মসূচির তুলনায় বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

এদিকে প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে এই রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ বিতর্কও যুক্ত হয়েছে। লেবার এমপি ডায়ান অ্যাবট রাশিয়ার হুমকিকে ‘ন্যাটোর বানানো গল্প’ বলে মন্তব্য করায় ইতোমধ্যে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বেডেনক তার এই অবস্থানেরও সমালোচনা করে বলেছেন, ন্যাটোর সদস্যপদ নিয়ে কনজারভেটিভদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর এবং দলটি ইউরোপের নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে ন্যাটোকে দেখে।

এর ফলে যুক্তরাজ্যে এখন দুটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—রাশিয়া ও অন্যান্য সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা খাতে কত টাকা ব্যয় করা প্রয়োজন এবং সেই অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণমূলক সুবিধায় কতটা কাটছাঁট করা হবে।

দ্য সানও এই বিতর্ককে সামনে রেখে পাঠকদের কাছে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে—প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য কি কল্যাণভাতা কমানো উচিত? সংবাদমাধ্যমটি এ বিষয়ে একটি জনমত জরিপ আয়োজন করেছে।

ফলে ব্রিটেনে প্রতিরক্ষা ব্যয় এখন শুধু সামরিক নীতির বিষয় নয়; এটি পরিণত হয়েছে পরিবারগুলোর আয়, আবাসন সহায়তা, শিশুদের সুবিধা, করনীতি এবং সরকারের সামগ্রিক ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াইয়ে। একদিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত অর্থের দাবি, অন্যদিকে সেই অর্থ জোগাতে কল্যাণভাতা কমানোর সম্ভাবনা—এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনগুলোতে ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম উত্তপ্ত ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

সূত্রঃ দ্য সান ও রয়টার্স

এম.কে

আরো পড়ুন

বৃটেনে নয় অন্য কোনো দেশে যেতে হবে আত্মহত্যা কর‍তে চাওয়া দুই শ্রীলঙ্কানকে

অভিবাসীদের জন্য স্বাস্থ্য কর বাড়ালো যুক্তরাজ্য

শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাজ্যে এসে সামাজিক সেবা খাতে পূর্ণকালীন কাজের অভিযোগঃ তদন্তের দাবি