17.1 C
London
October 13, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা রিমান্ডেঃ তদন্তে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও অর্থায়নের বিষয়

রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, সহিংসতায় উসকানি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ডিজিটাল উপকরণ এবং অবৈধ অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। সোমবার (১২ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলমের আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গ্রেপ্তার দুজন হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষ কুমার বড়ুয়া এবং লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরা।

ঢাকার পল্লবী থানায় করা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের পরিদর্শক শেখ বশির আহমেদ আদালতে এ আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ঘিরে তদন্তঃ

পুলিশের রিমান্ড আবেদনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পল্লবী এলাকার একটি বাসায় অবস্থান করে দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী ও সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল উপকরণ তৈরি এবং প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট অভিযোগে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স আলফা’ এবং ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’ নামের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কথা এসেছে। এসব গ্রুপের মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমর্থনে প্রচার, অর্থ সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক উপকরণ ছড়ানোর অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘ইউনিটি কেয়ার’ ও ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ নামের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পলাতক কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। একটি ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টার অভিযোগও আনা হয়েছে।

২০১৮ সালের বৈঠক ও সংগঠন গঠনের অভিযোগঃ

রিমান্ড আবেদনে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একটি গোলটেবিল বৈঠকের প্রসঙ্গও এসেছে বলে দৈনিক আমার দেশ জানিয়েছে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ওই বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ গঠন করা হয়েছিল এবং পরে সংগঠনটির ১০১ সদস্যের কমিটি করা হয়।

সংগঠনটির কার্যক্রম, সদস্যদের পরিচয় এবং কথিত যোগাযোগের ধরন সম্পর্কে তদন্তকারী সংস্থা কী তথ্য পেয়েছে, তা রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে যাচাই করা হতে পারে। পুলিশের আবেদনে দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়ঃ

ডিবি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই সাবেক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পরে তাদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। শুনানির সময় আদালতের হাজতখানা থেকে তাদের এজলাসে নেওয়া হয়।

দেবাশীষ ও গুলশান আরাকে ঘিরে গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগঃ

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার। দীর্ঘ নজরদারির পর একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা এই অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে উঠে এসেছে, আওয়ামীলীগের পক্ষে তারা কীভাবে তহবিল সংগ্রহ করছিলেন এবং গোপন হামলার ছক কষছিলেন।

গ্রেপ্তার হওয়া একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষ। ২০২২ সালে তাকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সবচেয়ে আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন। সাবেক সেনাপ্রধান আজিজের সরাসরি হস্তক্ষেপে নোটশিটের মাধ্যমে তিনি পদোন্নতি পান। সাবেক সেনাপ্রধান আজিজই তাকে ডিজিএফআই ও আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের মতো স্পর্শকাতর সংস্থায় নিজের হয়ে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেন। আজিজের হয়ে বিজিবিতে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের একটি চক্র পরিচালনা করতেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা দেবাশীষ ও তার পিতা দয়াল চন্দ্র পাল।

২০২৪ সালের আগস্টের পর সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ দেশ ছাড়লেও সাবেক সেনা কর্মকর্তা দেবাশীষ দেশে থেকেই সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামীলীগের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সাবেক ও কর্মরত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে গণমাধ্যম ও স্যোশাল মিডিয়ার তথ্যমতে জানা যায়।

সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একাধিক অভিযানে উদ্ধার হওয়া উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক পাওয়ার জেল দেশে আনার ঘটনায় সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা দেবাশীষের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

গ্রেপ্তার হওয়া অপরজন লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরা ২০০৬ সালে স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভারতীয় হ্যান্ডলার ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা দেবাশীষের সঙ্গে মিলে তিনি দেশব্যাপী সংঘবদ্ধ নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন। ঢাকায় ‘র’-এর সাবেক স্টেশন চিফ রাজেশ কুমার অগ্নিহোত্রীর ঘনিষ্ঠ গুলশান আরা তার নির্দেশে অন্তত আটজন সেনা কর্মকর্তাকে হানিট্র্যাপে ফেলেন, যাদের মধ্যে একজন মেজর জেনারেলও রয়েছেন। এ কারণে ২০১৯ সালে তাকে সব সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে রাওয়া ক্লাবে গুলশান আরার অবাধ যাতায়াত ছিল, সেনানিবাসেও প্রবেশ করতেন যে কোন সময়, আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি সহজেই সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের খুঁটিনাটি তথ্যও তার নাগালে ছিল। এর সূত্র ধরেই একাধিক ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে তার যোগাযোগ গড়ে ওঠে। সম্প্রতি তিনি বারিধারায় ভারতীয় হাইকমিশনের কার্যালয়ে মিনিস্টার (কনস্যুলার ও শিক্ষা) সুভাষ রামকৃষ্ণন পিল্লাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন।

এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কীঃ

অভিযুক্তদের ডিজিটাল যোগাযোগ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কার্যক্রম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত উপকরণ, অর্থের উৎস ও লেনদেন এবং কথিত রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য চার দিনের রিমান্ড দাবী করেন তদন্তকারীরা। তবে তদন্তে ঠিক কোন বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

এ মামলায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য ডিজিটাল উপাত্তের উৎস ও সত্যতা যাচাই, অর্থের লেনদেনের নথি পরীক্ষা এবং অভিযোগে উল্লেখ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রকৃতি নিরূপণ গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বক্তব্য এবং তাদের আইনজীবীদের অবস্থানও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বিবেচ্য।

আপাতত দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং কথিত যোগাযোগ ও অর্থায়নের বিষয়ে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনই তদন্তের মূল বিষয়।

সূত্রঃ আমার দেশ\প্রথম আলো\ স্যোশাল মিডিয়া

এমকে

আরো পড়ুন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে কোরবানি হচ্ছে না ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’

গুম-খুনের জন্য ক্ষমা চেয়ে ডিজি বললেন, ‘র‌্যাব এসবে আর জড়াবে না’

বাংলাদেশ হতে জার্মানিতে পোশাক রপ্তানি কমল ১৫ শতাংশ