TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকযুক্তরাজ্য (UK)

লিবিয়ায় জিম্মি ৩০০–এর বেশি ইউরোপগামী অভিবাসীঃ মুক্তিপণ না পেলে কিডনি অপসারণের হুমকি

ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চল থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ৩০০ জনেরও বেশি অভিবাসী গত গ্রীষ্মে লিবিয়ায় একটি সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীর হাতে অপহৃত হন। তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয় এবং পরিবারগুলোকে মুক্তিপণ দিতে বাধ্য করতে কিডনি অপসারণের হুমকি দেওয়া হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপহৃত ব্যক্তিদের সবাই ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের তরুণ। তাদের ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছিল একটি মানবপাচারকারী চক্র। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করার কথা ছিল। তবে লিবিয়ার মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং মানবপাচারকারী নোয়া অ্যারনের মধ্যে অর্থ লেনদেন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

বিবিসির তথ্যমতে, মিলিশিয়ারা অভিবাসীদের একটি সুরক্ষিত স্থাপনায় আটকে রেখে প্রতিটি পরিবারের কাছে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করে। পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়, দ্রুত অর্থ পরিশোধ না করলে জিম্মিদের কিডনি অপসারণ করা হবে। ভয় দেখাতে তারা জিম্মিদের নির্যাতনের ছবি ও ভিডিওও পরিবারের কাছে পাঠায়। একটি ভিডিওতে একজন তরুণকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়, যেখানে তার কিডনি অপসারণ করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।

বিবিসি মুক্তি পাওয়া কয়েকজন জিম্মির সঙ্গে কথা বলেছে। তারা জানান, অত্যন্ত অমানবিক পরিবেশে তাদের আটকে রাখা হয়েছিল। একজন ১৬ বছর বয়সী কিশোর বলেন, প্রায় ১৭৮ জনকে একটি ছোট কক্ষে রাখা হয়েছিল, যেখানে ছয় মাস সূর্যের আলো দেখা সম্ভব হয়নি। জায়গার সংকট এতটাই ছিল যে সবাইকে বসে বসেই ঘুমাতে হতো। একটি মাত্র শৌচাগার ব্যবহার করতে হতো সবাইকে, আর বেশি সময় নিলে মারধরের শিকার হতে হতো।

আরেকজন মুক্তিপ্রাপ্ত তরুণ তার পায়ে আগুনে পোড়ানোর দাগ দেখিয়ে জানান, বন্দিদশায় তাকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল। পরিবারগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দিদের প্রতিদিন মাত্র এক টুকরো রুটি দেওয়া হতো এবং অতিরিক্ত অর্থ দিলে তবেই খাবারের পরিমাণ বাড়ানো হতো।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত একজন জিম্মির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। তবে এখনও কতজন আটক রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। ইরাকি সরকারের উদ্যোগে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ১১০ জন জিম্মিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনের শরীরে অস্ত্রোপচারের মতো দাগ দেখা গেছে। এসব ছবি যুক্তরাজ্যের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পর্যালোচনা করে জানান, দাগগুলো কিডনি অপারেশনের সময় করা কাটার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তবে কেবল ছবি দেখে জোরপূর্বক অঙ্গ অপসারণের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এই ঘটনায় অভিযুক্ত মানবপাচারকারী নোয়া অ্যারন বর্তমানে ফ্রান্সে অর্থপাচার ও মানবপাচারসংক্রান্ত পৃথক মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। বিবিসির দাবি, অতীতে তার সঙ্গে আরেক মানবপাচারকারী কার্ডো জাফেরও যোগাযোগ ছিল। সম্প্রতি বিবিসির আরেক অনুসন্ধানের পর কার্ডো জাফকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবপাচারবিষয়ক এক বিশেষজ্ঞের মতে, লিবিয়ার বহু এলাকায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মানবপাচার ও মুক্তিপণের জন্য অপহরণের মতো অপরাধ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে এসব ঘটনার তদন্ত ও বিচার কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইরাকের কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এত ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও ইউরোপমুখী অবৈধ অভিবাসনের প্রবণতা কমেনি। তিনি জানান, লিবিয়ায় সন্দেহভাজন জোরপূর্বক অঙ্গ অপসারণের পর এক তরুণের মৃত্যুর ঘটনাও তাদের জানা আছে। কিন্তু ওই তরুণের দাফনের দিনই তার দুই চাচাতো ভাই ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তার ভাষায়, সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এমন মর্মান্তিক ঘটনাগুলো থেকেও মানুষ শিক্ষা নিচ্ছে না।

বিবিসির অনুসন্ধান আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের নৃশংসতা এবং ইউরোপমুখী অবৈধ অভিবাসনপথে অভিবাসীদের জীবন কতটা ঝুঁকির মুখে থাকে, তার একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবপাচার রোধে আন্তর্জাতিক সমন্বয়, সীমান্ত নজরদারি এবং সংঘাতপ্রবণ দেশগুলোতে আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

নতুন করে লকডাউনের ইঙ্গিত দেখছেন না বরিস জনসন

অনলাইন ডেস্ক

ইরানে সামরিক ক্ষমতা প্রয়োগে সিনেটে ভোটাভুটি, ফের জিতলেন ট্রাম্প

সৌদিতে নিষিদ্ধ তাবলিগ জামাত

অনলাইন ডেস্ক